মাধ্যমিক ২০২৬ পরীক্ষার্থীদের জন্য বাংলা বিষয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবিতা হল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘প্রলয়োল্লাস’। অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত এই কবিতাটি থেকে প্রতি বছর টেস্ট এবং ফাইনাল পরীক্ষায় ছোট, বড় প্রশ্ন আসেই। তাই, তোমাদের প্রস্তুতির সুবিধার্থে আমরা এই পোস্টে ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তরগুলি (MCQ, SAQ, ব্যাখ্যাধর্মী ও রচনামূলক) একসাথে নিয়ে এসেছি। এই প্রশ্নগুলি ভালোভাবে অনুশীলন করলে তোমরা পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে ভালো ফল করতে পারবে। সম্পূর্ণ সাজেশনটি তোমরা PDF আকারে ডাউনলোডও করে নিতে পারবে।
মাধ্যমিক বাংলা প্রলয়োল্লাস সাজেশন ২০২৬
❖ সঠিক উত্তরটি নির্বাচন করো
১. ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটি কোন কাব্যের অন্তর্গত? – (ক) ভাঙার গান (খ) প্রলয়শিখা (গ) অগ্নিবীণা (ঘ) ছায়ানট
উত্তরঃ (গ) অগ্নিবীণা
২. “আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য – (ক) রত (খ) দ্রুত (গ) পাগল (ঘ) মাতন
উত্তরঃ (গ) পাগল
৩. “বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে – (ক) নতুন (খ) দুর্নিবার (গ) শকট’ (ঘ) ভয়ংকর
উত্তরঃ (ঘ) ভয়ংকর
৪. “ঝামর তাহার কেশের দোলায় ঝাপটা মেরে গগন – (ক) মাতায় (খ) জ্বালায় (গ) দুলায় (ঘ) নাচায়
উত্তরঃ (গ) দুলায়
৫. “সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু তার চামর – (ক) দোলায় (খ) বোলায় (গ) ঢুলায় (ঘ) নাচায়
উত্তরঃ (গ) ঢুলায়
৬. “অট্টরোলের হট্টগোলে স্তব্ধ – (ক) বরাকর (খ) চরাচর (গ) গগন (ঘ) অন্তর
উত্তরঃ (খ) চরাচর
৭. “জগৎ জুড়ে কী ঘনিয়ে আসে? – (ক) রঙ্গ (খ) প্রলয় (গ) মেঘ (ঘ) বৃষ্টি
উত্তরঃ (খ) প্রলয়
৮. “আসবে উষা অরুণ হেসে – (ক) দারুণ বেশে (খ) মোহন বেশে (গ) করুণ বেশে (ঘ) নবীন বেশে
উত্তরঃ (গ) করুণ বেশে
৯. দিগম্বরের জটায় কে হাসে? (ক) শিশু চাঁদের কর (খ) পূর্ণ চাঁদের কর (গ) অর্ধ চাঁদের কর।(ঘ) ক্ষয়িত চাঁদের কর
উত্তরঃ (ক) শিশু চাঁদের কর
১০. কবি সবাইকে কী করতে আহ্বান জানিয়েছেন? (ক) বিপ্লব করতে (খ) বিদ্রোহ করতে (গ) প্রতিবাদ করতে (ঘ) জয়ধ্বনি করতে
উত্তরঃ (ঘ) জয়ধ্বনি করতে
১১. কবিতায় ব্যবহৃত ‘কেতন’ শব্দের অর্থ কী? (ক) পতাকা (খ) ঘর (গ) নিবাস (ঘ) ব্যজন
উত্তরঃ (ক) পতাকা
১২. প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কোন্ ঝড়ের কথা বলা হয়েছে? _ (ক) টর্নেডো (খ) ঘূর্ণি (গ) কালবৈশাখী (ঘ) ফাঁপি
উত্তরঃ (গ) কালবৈশাখী
১৩. কীসের দোলায় ঝামর ঝাপটা মেরে গগন দুলায়? (ক) হাওয়ার (খ) কেশের (গ) মেঘের (ঘ) জটার
উত্তরঃ (খ) কেশের
১৪. চামর চুলায় কে? (ক) চন্দ্র (খ) সূর্য (গ) নক্ষত্র (ঘ) ধূমকেতু
উত্তরঃ (খ) সূর্য
১৫. বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে কী ঝোলে? – (ক) ফল (খ) ফুল (গ) মুণ্ড (ঘ) কৃপাণ
উত্তরঃ (ঘ) কৃপাণ
১৬. পিঙ্গল জটায় কী লুটায়? – (ক) হাসি (খ) আনন্দ (গ) কাঁদন (ঘ) বেদন
উত্তরঃ (গ) কাঁদন
১৭. ‘কপোল’ শব্দের অর্থ কী? – (ক) কপাল (খ) গণ্ডদেশ (গ) কাঁচের পোল (ঘ) কোনোটিই নয়
উত্তরঃ (খ) গণ্ডদেশ
১৮. জীবনহারা অ-সুন্দরকে ছেদন করতে আসছে – (ক) নবীন (খ) প্রবীণ (গ) যুবা (ঘ) শিশু
উত্তরঃ (ক) নবীন
১৯. প্রলয় কোথায় উদ্ধা ছুটায়? – (ক) নীল খিলানে (খ) জগজুড়ে (গ) লাল খিলানে (ঘ) দিগন্তে
উত্তরঃ (ক) নীল খিলানে
মাধ্যমিক বাংলা প্রলয়োল্লাস সাজেশন ২০২৬
❖ অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন
১. “তোরা সব জয়ধ্বনি কর!”—কে, কাদের জয়ধ্বনি করতে বলেছেন?
উত্তরঃ মুক্তিকামী কবি নজরুল ইসলাম সমগ্র স্বদেশবাসীকে জয়ধ্বনি করতে বলেছেন।
২. “সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল।”—উদ্ধৃতাংশটিতে ‘সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তরঃ কবি শব্দবন্ধটি দ্বারা দেশবাসীকে সমুদ্রপারের ইংরেজ রাজশক্তি রাজপ্রাসাদের অবরুদ্ধ দরজাকে নির্দেশ করতে চেয়েছেন।
৩. “বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর!”—উদ্ধৃতাংশটিতে কবি ‘ভয়ংকর’ অভিধায় কাকে নির্দেশ করতে চেয়েছেন?
উত্তরঃ উদ্ধৃতাংশটিতে কবি অনাগত সুদিন তথা নতুন মহাকালের বেশে পুরাতনকে ধ্বংস করতে যেভাবে আসছে, তাকে ‘ভয়ংকর’অভিধায় অভিহিত করতে চেয়েছেন।
৪. “সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু তার চামর ঢুলায়!”—উদ্ধৃতাংশটিতে ‘ধূমকেতু’ ও ‘চামর’ শব্দ দুটির অর্থ কী?
উত্তরঃ উদ্ধৃতাংশটিতে ‘ধূমকেতু’ শব্দটি দিয়ে সৌরজগতের জ্যোতির্ময় পদার্থ বিশেষকে এবং ‘চামর’ শব্দটি দিয়ে চমরী গোরুর পুচ্ছ নির্মিত ব্যজন বা পাখাকে নির্দেশ করা হয়েছে।
৫. “দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা ভয়াল তাহার নয়নকটায়,”—উদ্ধৃতাংশটিতে যে দ্বাদশ রবির কথা বলা হয়েছে, তাদের নাম উল্লেখ করো।
উত্তরঃ কবি উদ্ধৃতাংশে যে পুরাণ কথিত দ্বাদশ রবির কথা উল্লেখ করেছেন তারা হলেন—বিবস্বান, অর্যমা, পূষা, ত্বষ্টা, সবিদা, ভগ, ধাতা, বিধাতা, বরুণ, মিত্র, শত্রু, উরুক্রম নামধারী সূর্য।
৬. “দিগম্বরের জটায় হাসে শিশু-চাঁদের কর”—উদ্ধৃতাংশে কোন্ দেবতার অস্তিত্ব কল্পনা করা হয়েছে?
উত্তরঃ উদ্ধৃতাংশে দিগম্বর অর্থাৎ দেবাদিদেব মহাদেবের অস্তিত্ব কল্পনা করা হয়েছে যার শিরচূড়ায় উদীয়মান চাঁদের কল্পনা করা হয়েছে।
৭. “খুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় নীল খিলানে!”—উদ্ধৃতাংশে উল্লিখিত ‘উল্কা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: উদ্ধৃতাংশে কবি ‘উল্কা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন মহাকালের যুদ্ধোদ্যত স্বরূপের তীব্রতা বোঝানোর জন্য। বিজ্ঞানের ভাষায় উল্কা বলতে বোঝায় আকাশের বুকে ভ্রাম্যমাণ অগ্নিপিণ্ড যার মাঝেমাঝে ভূপৃষ্ঠে পতন ঘটে।
৮. “ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?” —ধ্বংস দেখেও তাকে ভয় না-করার কথা বলা হয়েছে কেন?
উত্তরঃ কবি যে ধ্বংসের কথা বলেছেন, সেই মহাকালের ভয়ংকর ধ্বংসলীলার মধ্যেও নবসৃষ্টির বীজ নিহিত থাকে। সেইজন্যই কবি এই ধ্বংস দেখে তাকে ভয় না-করার কথা বলেছেন।
৯. “বধুরা প্রদীপ তুলে ধর!”—কীসের জন্য বধূদের প্রদীপ তুলে ধরার কথা বলা হয়েছে?
উত্তরঃ মহাকাল ভয়ংকর বেশে অ-সুন্দরকে ধ্বংস করে সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করতে আসছে। তাই তার আগমনকে বরণ করে নেওয়ার জন্য বধূদের প্রদীপ তুলে ধরার কথা বলা হয়েছে।
১০. “আসবে উষা অরুণ হেসে”—উষা কখন আসবে?
উত্তরঃ কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ নামক কবিতায় অরুণ হেসে উষা আসবে মহানিশার শেষে তথা মহারাত্রির পর।
১১. দিগম্বরের কাঁদন কোথায় লুটায়?
উত্তরঃ কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় দিগম্বরের কাঁদন পিঙ্গল এস্ত জটায় লুটায়।
১২. রক্তমাখা কৃপাণ কোথায় ঝোলে?
উত্তরঃ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রলয়োল্লাস নামক কবিতায় রক্তমাখা কৃপাণ বিশ্বপাতার বক্ষকোলে দোলে।
১৩. কালবৈশাখীর ঝড় কীরূপে আসে?
উত্তরঃ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কালবৈশাখীর ঝড় মহাকালের চণ্ডরূপে আসে। ধোঁয়ায় ধূপর রূপেও আসে।
❖ সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন
প্রশ্ন- “আসছে নবীন- জীবনহারা অ-সুন্দরকে করতে ছেদন?”- উক্তিটির তাৎপর্য লেখো। ১+২
উত্তরঃ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় প্রলয়ের দেবতা রুদ্রদেবকে আহ্বান জানানো হয়েছে। কবির কল্পনায়, দেশের নবীন প্রজন্মই হল নবযুগের বার্তাবাহী সেই রুদ্রদেব। দেশমাতৃকার মুক্তিসাধনার ব্রতে ব্রতী তরুণ বিপ্লবীরা প্রথমেই জরাজীর্ণ পুরাতন মানসিকতার উপর আঘাত হানবে। যা কিছু জীবনীশক্তিহীন তথা অসুন্দর, সেই সবকিছুর বিনাশ করবে তারা। এইভাবে একটি মৃতপ্রায় সমাজব্যবস্থার ধ্বংসের মধ্য দিয়ে তারা নতুন যুগের সূচনা করবে।
প্রশ্ন- “প্রলয় বয়েও আসছে হেসে”- উদ্ধৃত অংশের তাৎপর্য লেখো। ৩
উত্তরঃ কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় প্রলয়ের দেবতা রুদ্রদেবকে আহ্বান জানানো হয়েছে। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, ধ্বংসের দেবতা রুদ্রদেব পুরাতন যুগের অবসান ঘটিয়ে নতুন যুগের সূচনা করেন। শুধু পুরাণে নয়, ইতিহাসেও দেখা গেছে যে, পুরাতন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন সভ্যতার জন্ম হয়। কালের নিয়ম এটাই যে, পুরাতনকে বিদায় নিতে হয় এবং নতুনের আবির্ভাব ঘটে। অর্থাৎ, ধ্বংসের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা। এইজন্য প্রলয়ঙ্কর প্রলয় বয়ে আনলেও মুখে তার হাসি।
❖ রচনামূলক প্রশ্ন
প্রশ্ন- “ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন” – কোন ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে? প্রলয়কে কেন ‘নূতন সৃজন-বেদন’ বলা হয়েছে?
উত্তরঃ কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবি পুরাতন, ক্ষয়িষ্ণু সমাজব্যবস্থা তথা পুরাতন মানসিকতার ধ্বংসের কথা বলেছেন।
আলোচ্য কবিতায় কবি এই সত্যকেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন যে, ধ্বংসের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সৃষ্টির বীজ। যেমন, ধ্বংসাত্মক কালবৈশাখী ঝড়ে অনেক গাছপালা ভেঙে পড়ে, বহু ক্ষয়ক্ষতি হয়। কিন্তু ঝড়ের ফলে একদিকে যেমন গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তেমনি বায়ুবাহিত বীজের মাধ্যমে অনেক নতুন চারাগাছের জন্ম হয়।
(পর্দার ওপরে “proloy” শব্দটি প্রদর্শিত হয়)
কবি পরাধীন ভারতবাসীকে ব্রিটিশদের অপশাসনের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য ধ্বংসের দেবতাকেই আহ্বান করেছেন। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, ধ্বংসের দেবতা হলেন রুদ্রদেব। তবে, বাস্তবে কবি দেশের তরুণ বিপ্লবীদের আহ্বান জানিয়েছেন। এই তরুণ বিপ্লবীরা দেশকে পরাধীনতার বন্ধন থেকে মুক্ত করবে বলে কবি আশা পোষণ করেছেন। তবে, স্বাধীনতা লাভের পথ এতটা মসৃণ নয়। বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত দেশের নবীন প্রজন্মকে প্রথমেই হীনবল ভারতবাসীর দীনহীন মানসিকতাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে, তারপরেই তারা ব্রিটিশ রাজশক্তিকে ভারত থেকে উৎখাত করতে পারবে। কবির মতে, তরুণ বিপ্লবীদের ভূমিকা আপাতদৃষ্টিতে ধ্বংসাত্মক মনে হতে পারে। তাদের কর্মকাণ্ডে সমাজের স্থিতাবস্থা সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হলেও সেটা নতুন সৃষ্টির প্রতিক্রিয়া ছাড়া আর কিছু নয়। সন্তানের জন্ম দেওয়ার সময় জননী যেমন প্রসব-বেদনা অনুভব করে, তেমনি বিপ্লবীদের ক্রিয়াকলাপের মধ্যেও থাকবে নতুনের ‘সৃজন-বেদনা’।
প্রশ্ন- ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় একদিকে ধ্বংসের চিত্র, আরেকদিকে নতুন আশার বাণী কীভাবে ফুটে উঠেছে, তা কবিতা অবলম্বনে লেখো। ৫
উত্তরঃ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় একদিকে রয়েছে ধ্বংসের চিত্র, আরেকদিকে রয়েছে নতুন আশার বাণী। ধ্বংস সব অর্থেই নেতিবাচক, কিন্তু আলোচ্য কবিতায় কবি ধ্বংসের ভয়াবহতার মধ্যে আশার আলোর সন্ধান পেয়েছেন। কবিতার শুরুতেই ধ্বংসাত্মক কালবৈশাখী ঝড়ের উল্লেখ রয়েছে। তবে, সেই কালবৈশাখী কবির কাছে শুধু ধ্বংসের প্রতীক নয়, ঝড়ের তাণ্ডবের মধ্যেই কবি নবযুগের কেতন উড়তে দেখেছেন। ভারতকে পরাধীনতার বন্ধন থেকে মুক্ত করার জন্য কবি যাকে আহ্বান করেছেন, তিনিও ধ্বংসের প্রতীক। তার পরিচয় দিতে গিয়ে কবি বলেছেন, “প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল”।
‘সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু’ আজ্ঞাবাহী দাসের মতো তার সেবা করে। তার রক্তমাখা তরবারি এবং বজ্রশিখার মশাল দেখে সমস্ত চরাচর যেন স্তব্ধ। জগৎজুড়ে প্রলয় ঘনিয়ে আসছে দেখেও কবি আশা প্রকাশ করেছেন, “জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ-লুকানো ওই বিনাশে!” ওই প্রলয়ের পরেই যেন দীর্ঘ অমাবস্যার সমাপ্তি ঘটবে এবং নতুন দিনের সূচনা হবে।
আবার, মহাকালের সারথি হিসেবে প্রলয়ঙ্করের আগমনের মধ্যেও ধ্বংসের ছায়া চোখে পড়ে। কিন্তু প্রলয়ঙ্করের আগমনের কারণটা ইতিবাচক। এতদিন ধরে যেসব দেবতাদের ‘অন্ধ কারার বন্ধ কূপে’ বন্দি করে রাখা হয়েছিল, তাদের উদ্ধার করার জন্যই মহাকালের সারথি প্রলয়ঙ্কর এগিয়ে আসছেন। অন্যভাবে বললে, কারারুদ্ধ স্বাধীনতাকামী তরুণ বিপ্লবীদের মুক্ত করার জন্যই ধ্বংসের দেবতা রুদ্রদেব আসছেন। এভাবেই সমগ্র কবিতা জুড়ে কবি একদিকে ধ্বংসের চিত্র তুলে ধরেছেন, আরেকদিকে নতুন আশার বাণী শুনিয়েছেন।
প্রশ্ন- “তোরা সব জয়ধ্বনি কর”- কাদের উদ্দেশ্যে কবি এই আহ্বান? কবিতার ভাববস্তু বিশ্লেষণ করে এই জয়ধ্বনির যৌক্তিকতা বিচার কর।
উত্তরঃ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় পরাধীনতার শৃঙ্খলায় আবদ্ধ ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে এই আহ্বান করেছেন।
আলোচ্য কবিতায় কবি ব্রিটিশের অত্যাচারে জর্জরিত ভারতবাসীর দুর্দশা মোচনের জন্য এমন একজনকে আহ্বান জানিয়েছেন, যিনি আগে কখনো আসেন নি। সেই ‘অনাগত’ হলেন ‘প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল’। প্রচণ্ড কালবৈশাখী ঝড়ের মত তিনিও তাণ্ডব করবেন। তার তাণ্ডবের মধ্যেই কবি নতুন যুগের নিশান দেখতে পেয়েছেন। কালবৈশাখী ঝড় যেমন ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নতুন সৃষ্টির বীজ বপন করে, প্রলয়ঙ্কর তেমনি নতুন সমাজের ভিত্তি স্থাপন করবে। এইজন্য কবি সকলকে জয়ধ্বনি করতে করতে বলেছেন।
যিনি আসছেন তিনি ভয়ংকর, তিনি প্রলয়ঙ্কর। জগৎ জুড়ে তিনি ধ্বংসলীলা চালাবেন। কিন্তু ওই ধ্বংসের মধ্যেই ‘জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ’ লুকিয়ে আছে। পুরাতন সমাজব্যবস্থার ধ্বংস করে নতুন যুগের সূচনা করবেন বলেই কবি সকল দেশবাসীকে তার উদ্দেশ্যে জয়ধ্বনি করতে বলেছেন।
তিনি ভারতবাসীকে পরাধীনতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করবেন এবং নতুন আলোর সন্ধান দেবেন। এইজন্য কবি সকলকে জয়ধ্বনি করতে বলেছেন।
ব্রিটিশ রাজশক্তি স্বাধীনতাকামী তরুণ বিপ্লবীদের অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করেছিল। কবি আক্ষেপ করে বলেছেন, “অন্ধ কারার বন্ধ কূপে/ দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যূপে”। এইসব দেবতা-সম বিপ্লবীদের উদ্ধার করবেন তিনি। এইজন্য কবি তাকে স্বাগত জানিয়ে সকল দেশবাসীকে তার উদ্দেশ্যে জয়ধ্বনি করতে বলেছেন।