অসুখী একজন কবিতা প্রশ্নোত্তর | মাধ্যমিক বাংলা ২০২৫
পাবলো নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতাটি মাধ্যমিক বাংলা ২০২৫ সালের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য কবিতা। এই কবিতায় প্রেম, বিচ্ছেদ, যুদ্ধ ও মানবতার নিদারুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে গভীর অনুভূতির মাধ্যমে। পরীক্ষার্থীদের জন্য এই কবিতার ৩ নম্বর প্রশ্ন বা দীর্ঘ উত্তরভিত্তিক প্রশ্নগুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই পোস্টে আমরা ধারাবাহিকভাবে কবিতার উদ্ধৃত অংশ নিয়ে প্রশ্ন ও সেগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছি, যাতে ছাত্রছাত্রীরা সহজেই প্র্যাকটিস করে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারে।
1. “আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।” – কে কাকে ছেড়ে দিয়েছিল? কেন?
উত্তর: পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কথক তাঁর প্রিয় নারীকে অপেক্ষায় রেখে নিজ বাসভূমি ছেড়ে দূরে চলে যান। স্বদেশ ত্যাগের সময় তিনি জানতেন, আর কখনো ফিরে আসবেন না। এই বিদায়টি চিরকালীন ছিল।
2. “বৃষ্টিতে ধুয়ে দিল আমার পায়ের দাগ / ঘাস জন্মালো রাস্তায়” – উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: কবি দূরে চলে গেলে সময় থেমে থাকে না। সপ্তাহ-মাস-কেটে যায়, তার পদচিহ্ন মুছে যায়, তাতে ঘাস জন্মে। কিন্তু প্রিয়জনের হৃদয়ে রয়ে যায় তার চিরন্তন বিদায় ও অপেক্ষা।
3. “পাথরের মতো পর পর পাথরের মতো বছরগুলো” – কেন বলা হয়েছে?
উত্তর: কবির চলে যাওয়ার পর তার প্রিয়তমার জীবনের সময় যেন ভারী পাথরের মতো বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিচ্ছেদ বেদনার গভীরতা বোঝাতে এই উপমাটি ব্যবহার করেছেন কবি।
4. যুদ্ধকে “রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়” বলা হয়েছে কেন?
উত্তর: আগ্নেয়গিরির মতো যুদ্ধও সব ধ্বংস করে দেয়। হিংসা-দ্বেষ মানুষের মন থেকে লাভার মতো বিস্ফোরিত হয়। জীবন, ভালোবাসা, বিশ্বাস সব কিছু পুড়ে যায়।
5. “সেই মেয়েটির মৃত্যু হলো না” – কোন মেয়েটির? কেন তার মৃত্যু হয়নি?
উত্তর: কথকের প্রিয়তমার মৃত্যু হয়নি কারণ সে চিরকাল অপেক্ষা করেছে। যুদ্ধের ধ্বংসেও ভালোবাসার শক্তি তাকে রক্ষা করে। প্রেম অমর – এই বিশ্বাস ফুটে উঠেছে।
6. “শান্ত হলুদ দেবতারা” – কেন বলা হয়েছে? তাদের কী পরিণতি হয়?
উত্তর: দেবতাদের জীর্ণতা বোঝাতে ‘শান্ত হলুদ’ বলা হয়েছে। যুদ্ধ তাদেরও ধ্বংস করে, মানুষের বিশ্বাসও চূর্ণ হয়।
7. “তারা আর স্বপ্ন দেখতে পারল না” – কারা? কেন?
উত্তর: দেবতারা। যুদ্ধ ও ধ্বংস এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে দেব-মাহাত্ম্যও অক্ষম হয়ে পড়ে। তারা মানুষের মতোই স্বপ্নহীন ও অসহায়।
8. “প্রাচীন জলতরঙ্গ / সব চূর্ণ হয়ে গেল” – কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: কবির শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি, আসবাব, স্মৃতিচিহ্ন – সব কিছু যুদ্ধের আগুনে ধ্বংস হয়ে যায়। অস্তিত্বের প্রতীক মুছে যায়।
9. “সেখানে ছড়িয়ে রইল কাঠকয়লা” – কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: যুদ্ধোত্তর শহরের বীভৎস রূপ বোঝাতে এই চিত্র। আগুনে জ্বলে যাওয়া শহর আর শুধু কাঠকয়লা ও মৃত স্মৃতিচিহ্নে ভরা।
10. “আর সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়” – মেয়েটি কে? সে অপেক্ষা করে কেন?
উত্তর: কথকের প্রিয়তমা। কবি যে আর ফিরবেন না, তা সে জানত না। ভালোবাসা থেকেই সে অপেক্ষায় ছিল – যুদ্ধ, মৃত্যু কিছুই তাকে দমাতে পারেনি।
11. “শান্ত হলুদ দেবতারা / যারা হাজার বছর ধরে ডুবেছিল ধ্যানে” – অর্থ কী?
উত্তর: দেবতারা নিষ্ক্রিয়, জীর্ণ এবং অসহায় প্রতীক। তারা হাজার বছর ধরে ধ্যানে মগ্ন থাকলেও মানবতার রক্ষায় অক্ষম। এই অসারতা বোঝাতেই কবি এ ভাষা ব্যবহার করেছেন।
12. “সে জানত না” – কে? কী জানত না?
উত্তর: প্রিয়তমা জানত না যে, কবি আর ফিরে আসবেন না। সেই অজ্ঞতা থেকেই সে চিরদিন অপেক্ষায় থেকেছে। বিদায়টি একতরফা হলেও মেয়েটি তা বোঝেনি।
13. “উল্টে পড়ল মন্দির থেকে টুকরো টুকরো হয়ে” – কী পড়ল? কেন?
উত্তর: যুদ্ধের সময় শান্ত হলুদ দেবতারা ও তাদের মন্দির ধ্বংস হয়ে যায়। যুদ্ধ মানুষের বিশ্বাস, ধর্ম – সব কিছুকে ভেঙে ফেলে। মন্দিরের ধ্বংস মানে চিরায়ত দেবত্বের পতন।
ম্যাট্রিকুলার নতুন চ্যানেল মেট্রিকুলা বাংলায় তোমাদের সকলকে স্বাগত জানাই। প্রত্যেক বছরের মতো এ বছরেও আমরা চলে এসেছি ক্লাস টেনের লাস্ট মিনিট সাজেশন নিয়ে। অধ্যায় ভিত্তিক ভাবে আমাদের টিচাররা তোমাদের জন্য এই লাস্ট মিনিট সাজেশন প্রিপেয়ার করেছেন। বিগত বছরগুলিতে যেমন তোমরা ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কমন কোয়েশ্চেন পেয়েছো, এ বছরেও তোমরা ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কমন কোয়েশ্চেন পাবেই লাস্ট মিনিট সাজেশন থেকে, এটাই আমরা আশা করছি।
আজকের বিষয় বাংলা। অধ্যায় ৬। অসুখী একজন। লিখেছেন পাবলো নেরুদা।
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর (মান – ১)
১. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যে বাদ্যযন্ত্রটির উল্লেখ আছে-
(ক) বীণা (খ) জলতরঙ্গ (গ) বাঁশি (ঘ) তানপুরা।
সঠিক উত্তর: (খ) জলতরঙ্গ
২. ‘অসুখী একজন’ কবিতাটি তর্জমা করেছেন-
(ক) সুকান্ত ভট্টাচার্য (খ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (গ) কাজী নজরুল ইসলাম (ঘ) নবারুণ ভট্টাচার্য।
সঠিক উত্তর: (ঘ) নবারুণ ভট্টাচার্য
৩. কথক বিদায় নেওয়ার পর কয়টি সপ্তাহ/বছর কাটার কথা বলা হয়েছে?
(ক) অসংখ্য (খ) একটা (গ) হাজার (ঘ) হাজার হাজার।
সঠিক উত্তর: (খ) একটা
৪. “নেমে এল তার মাথার উপর”-কী নেমে এল?
(ক) মেঘ (খ) বছর (গ) মাস (ঘ) দিন।
সঠিক উত্তর: (খ) বছর
৫. “সে জানত না”-সে কী জানত না?
(ক) কথক তাকে ছেড়ে দূরে চলে যাবে (খ) কথক আর কখনো ফিরে আসবে না (গ) ভয়ঙ্কর যুদ্ধ শুরু হবে (ঘ) তার মৃত্যু হবে না।
সঠিক উত্তর: (খ) কথক আর কখনো ফিরে আসবে না
৬. আমি কোথায় ঘুমিয়েছিলাম?
(ক) ঝুলন্ত বিছানায় (খ) গাছের ছায়ায় (গ) নাটমন্দিরে (ঘ) রাস্তায়।
সঠিক উত্তর: (ক) ঝুলন্ত বিছানায়
৭. “বৃষ্টিতে ধুয়ে দিল” বৃষ্টি ধুয়ে দিয়েছিল-
(ক) পায়ের দাগ (খ) রক্তের দাগ (গ) পথের ধুলো (ঘ) কাঠকয়লার দাগ।
সঠিক উত্তর: (ক) পায়ের দাগ
৮. “হেঁটে গেল গির্জার এক।” (শূন্যস্থান পূরণ)
(ক) মৌলবি (খ) নান (গ) সন্ন্যাসী (ঘ) পুরোহিত।
সঠিক উত্তর: (খ) নান
৯. অপেক্ষারতা মেয়েটির মাথার উপর বছরগুলো নেমে এসেছিল-
(ক) ঘূর্ণিঝড়ের মতো (খ) রক্তের আগ্নেয় পাহাড়ের মতো (গ) যুদ্ধের মতো (ঘ) পর পর পাথরের মতো।
সঠিক উত্তর: (ঘ) পর পর পাথরের মতো
১০. “অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রেখে” কোথায় দাঁড় করিয়ে রাখে?
(ক) দরজায় (খ) রাস্তায় (গ) বাড়িতে (ঘ) লাইব্রেরিতে।
সঠিক উত্তর: (ক) দরজায়
১১. শান্ত হলুদ দেবতারা ধ্যানে ডুবে ছিল-
(ক) কয়েক যুগ (খ) হাজার হাজার বছর (গ) হাজার বছর (ঘ) সহস্র বছর।
সঠিক উত্তর: (গ) হাজার বছর
১২. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কবি কোথায় চলে গেছেন?
(ক) কাছে (খ) বাইরে (গ) বারান্দায় (ঘ) দূরে।
সঠিক উত্তর: (ঘ) দূরে
১৩. মিষ্টি বাড়িটির কোথায় ঝুলন্ত বিছানাটি ছিল?
(ক) ছাদে (খ) উঠোনে (গ) বারান্দায় (ঘ) গোলাপি গাছের পাশে।
সঠিক উত্তর: (গ) বারান্দায়
১৪. “একটা কুকুর চলে গেল, হেঁটে গেল গির্জার এক নান”-এরপর কত বছর কেটে যায়?
(ক) চার বছর (খ) তিন বছর (গ) দুই বছর (ঘ) এক বছর।
সঠিক উত্তর: (ঘ) এক বছর
১৫. একটা সপ্তাহ আর __ কেটে গেল।
(ক) একদিন (খ) একমাস (গ) একটা বছর (ঘ) একটা যুগ।
সঠিক উত্তর: (গ) একটা বছর
১৬. “বছরগুলো নেমে এল তার মাথার ওপর।” কিসের মতো?
(ক) বৃষ্টির মতো (খ) তুষারপাতের মতো (গ) পাথরের মতো (ঘ) পরির মতো।
সঠিক উত্তর: (গ) পাথরের মতো
১৭. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় দেবতাদের বিশেষণ দেওয়া হয়েছে-
(ক) মৃত (খ) শান্তশিষ্ট (গ) শান্ত হলুদ (ঘ) ধ্যানমগ্ন।
সঠিক উত্তর: (গ) শান্ত হলুদ
১৮. পাবলো নেরুদা ছিলেন-
(ক) রাশিয়ান কবি ও সৈনিক (খ) চিলিয়ান কবি ও রাজনীতিবিদ (গ) জার্মান কবি ও গায়ক (ঘ) আফ্রিকান কবি ও সৈনিক।
সঠিক উত্তর: (খ) চিলিয়ান কবি ও রাজনীতিবিদ
১৯. “তারপর যুদ্ধ এল”-যুদ্ধ এসেছিল-
(ক) লাভা ভর্তি আগ্নেয়গিরির মতো (খ) মৃত্যুর মতো (গ) রক্তের এক সমুদ্রের মতো (ঘ) রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো।
সঠিক উত্তর: (ঘ) রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো
২০. “অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রেখে দরজায়”-কথক দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন-
(ক) গির্জার নানকে (খ) শিশুদেরকে (গ) মেয়েটিকে (ঘ) মা-কে।
সঠিক উত্তর: (গ) মেয়েটিকে
২১. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় মৃত্যু হয়নি-
(ক) গ্রামের (খ) মেয়েটির (গ) শিশুদের (ঘ) দেবতাদের।
সঠিক উত্তর: (খ) মেয়েটির
২২. উলটে পড়ল মন্দির থেকে টুকরো টুকরো হয়ে- কারা উলটে পড়েছিল?
(ক) মন্দিরের চূড়া (খ) শান্ত হলুদ দেবতারা (গ) পূজার বেদী (ঘ) জলতরঙ্গ।
সঠিক উত্তর: (খ) শান্ত হলুদ দেবতারা
২৩. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যে কালো দাগটির কথা বলা হয়েছে, তা হল-
(ক) কয়লার (খ) বেদনার (গ) রক্তের (ঘ) শোকের।
সঠিক উত্তর: (গ) রক্তের
২৪. ‘ঘাস জন্মালো’-কোথায়?
(ক) উঠোনে (খ) মন্দিরে (গ) রাস্তায় (ঘ) মাঠে।
সঠিক উত্তর: (গ) রাস্তায়
২৫. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় উল্লিখিত বীভৎস মাথাগুলি ছিল-
(ক) মৃত শিশুদের (খ) মৃত মেয়েটির (গ) ধ্যানমগ্ন দেবতাদের (ঘ) মৃত পাথরের মূর্তির।
সঠিক উত্তর: (ঘ) মৃত পাথরের মূর্তির
২৬. যেখানে ছিল শহর/সেখানে ছড়িয়ে রইল-
(ক) পায়ের দাগ (খ) কাঠ কয়লা (গ) ধুলোবালি (ঘ) ছাই।
সঠিক উত্তর: (খ) কাঠ কয়লা
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান – ১)
১. ‘শিশু আর বাড়িরা খুন হল’-শিশু আর বাড়িরা কেন খুন হয়েছিল?
উত্তর: ভয়ঙ্কর যুদ্ধের তাণ্ডবে সমগ্র সমতলে আগুন ধরে যায়। আর তাতেই খুন হয় শিশু আর বাড়িরা।
২. ‘অসুখী একজন’ কবিতাটি বাংলায় কে তর্জমা করেছেন?/কবিতার অনুবাদক কে?
উত্তর: অসুখী একজন কবিতাটি বাংলায় তর্জমা করেছেন নবারুণ ভট্টাচার্য।
৩. ‘সমস্ত সমতলে ধরে গেল আগুন’-কেন এমন হল?
উত্তর: যুদ্ধের সর্বগ্রাসী বীভৎসতায় সমস্ত সমতলে আগুন ধরেছিল।
৪. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কবি চলে যাওয়ার আগে ‘তাকে’ কী অবস্থায় ছেড়ে আসেন?
উত্তর: পাবলো নেরুদা ‘তাকে’ তথা এক নারীকল্প দেশমাতৃকাকে দরজায় পরম অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রেখে চলে গিয়েছিলেন দূর থেকে দূরে।
৫. “অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রেখে দরজায়”-কে, কাকে দাঁড় করিয়েছিল?
উত্তর: কথক অপেক্ষারতা মেয়েটিকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখেছিল।
৬. ‘তারপর যুদ্ধ এল’- যুদ্ধ এলে কী ঘটল?
উত্তর: পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতায় দেখা যায় যুদ্ধে শিশু আর বাড়িগুলি খুন হয়, কিন্তু কবির ছেড়ে যাওয়া মেয়েটির মৃত্যু হয় না।
৭. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কে ফিরে না আসার কথা জানত না?
উত্তর: অপেক্ষারতা মেয়েটি কথকের ফিরে না আসার কথা জানত না।
৮. “বৃষ্টিতে ধুয়ে দিল আমার পায়ের দাগ”-এর অর্থ কী?
উত্তর: উদ্ধৃতিটির অর্থ প্রকৃতির নিয়মে প্রকৃতির বুকে মানুষের স্মৃতি মুছে দেওয়া।
৯. ‘সেখানে ছড়িয়ে রইল কাঠ কয়লা’-কোথায় কাঠ কয়লা ছড়িয়ে রইল?
উত্তর: যুদ্ধের আগে যেখানে শহর ছিল, যুদ্ধ শেষে সেখানে কাঠ-কয়লা ছড়িয়ে রইল।
১০. “রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো।” এটি কীসের উপমা?
উত্তর: পাবলো নেরুদা প্রণীত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় এটি স্পেনের গৃহযুদ্ধের উপমা।
১১. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যুদ্ধ শেষে মেয়েটি কী করছিল?
উত্তর: যুদ্ধ শেষে মৃত্যুহীনা মেয়েটি কথকের অপেক্ষায় পথ চেয়েছিল।
১২. “সেই মেয়েটির মৃত্যু হলো না।” কেন মৃত্যু হলো না?
উত্তর: কবি পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কালান্তক যুদ্ধে বহু শিশু ও গৃহস্থের মৃত্যু হলেও কথকের অপেক্ষায় থাকা মেয়েটির মৃত্যু হলো না।
১৩. ‘তারা আর স্বপ্ন দেখতে পারলো না’-কেন তারা স্বপ্ন দেখতে পারেনি?
উত্তর: যুদ্ধের দাপটে ধ্যানমগ্ন শান্ত হলুদ দেবতারা মন্দির থেকে উলটে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল, তাই তারা আর স্বপ্ন দেখতে পারেনি।
১৪. “রক্তের একটা কালো দাগ” কী কারণে এই রক্তপাত?
উত্তর: স্পেনের গৃহযুদ্ধে (১৯৩৬-৩৯) বহু মানুষ হতাহত হয়, তাই এই রক্তপাত।
১৫. “সব চূর্ণ হয়ে গেল”-কী কী চূর্ণ হয়েছিল?/জ্বলে গেল আগুনে’-আগুনে কী কী জ্বলে ছিল?
উত্তর: কথকের স্মৃতি বিজড়িত মিষ্টি বাড়ি, চিমনি, গোলাপি গাছ, জলতরঙ্গ সবকিছু যুদ্ধের দাপটে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
১৬. “সেই মিষ্টি বাড়ি”-বাড়িটিকে বক্তা মিষ্টি বলেছেন কেন?
উত্তর: বাড়িটির সঙ্গে কবির অনেক প্রিয় স্মৃতি যুক্ত হয়ে থাকায় বাড়িটি মিষ্টি।
১৭. “রক্তের একটা কালো দাগ”-কালো দাগ কীসের প্রতীক?
উত্তর: সর্বগ্রাসী যুদ্ধের ভয়াবহতার স্মৃতিচিহ্ন হল রক্তের এই কালো দাগ।
১৮. “আর সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়।” বক্তার জন্য মেয়েটির অপেক্ষার কারণ কী?
উত্তর: কারণ বক্তার সঙ্গে মেয়েটির সম্পর্ক প্রেমিক-প্রেমিকার, তাই সে বক্তার অপেক্ষায় থাকে।
১৯. “সেখানে ছড়িয়ে রইল”-কোথায় কী ছড়িয়েছিল?
উত্তর: ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরে ছড়িয়ে ছিল কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা, মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা আর রক্তের নিকষ কালো দাগ।
২০. ‘সে জানত না’-‘সে’ কী জানত না?
উত্তর: অপেক্ষারতা মেয়েটি জানত না যে তার প্রিয়জন আর কখনো ফিরে আসবে না।
২১. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যুদ্ধকে কীসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?
উত্তর: ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যুদ্ধকে রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
২২. ‘যেখানে ছিল শহর’ সেখানে যুদ্ধের পর কী অবস্থা হয়েছিল?
উত্তর: যেখানে একদা প্রাণচঞ্চল শহর ছিল, যুদ্ধের পর সেখানে প্রাণহীন শ্মশানের মতো কাঠকয়লা ছড়িয়ে ছিল।
২৩. নেমে এল তার মাথার ওপর’-কার মাথার উপর, কী নেমে এসেছিল?
উত্তর: অপেক্ষারত মেয়েটির মাথার উপর পর পর পাথরের মতো ভারী ও নিষ্ঠুর বছরগুলি নেমে এসেছিল।
২৪. অসুখী একজন’ কবিতায় কথকের স্বপ্নবিজড়িত বাড়ির পরিবেশটি কেমন ছিল?
উত্তর: অসুখী একজন’ কবিতায় স্বপ্নবিজড়িত কথকের বাড়িটি ছিল ভারি মিষ্টি। সেই বাড়ির বারান্দায় ঝুলন্ত বিছানায় কথক ঘুমাতেন। গোলাপি গাছ, চিমনি, জলতরঙ্গও ছিল সেই বাড়িতে।
২৫. ‘তারপর যুদ্ধ এল’-এই যুদ্ধের প্রকৃতি কেমন ছিল? কীভাবে যুদ্ধ এল?
উত্তর: ‘অসুখী একজন’ কবিতায় বর্ণিত যুদ্ধের প্রকৃতি ছিল রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো।
ব্যাখ্যাভিত্তিক সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (মান – ৩)
১. ‘সেই মেয়েটির মৃত্যু হল না’-কোন মেয়েটির কথা বলা হয়েছে? কেন তার মৃত্যু হল না? অথবা ‘সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়’-মেয়েটি কে? তার অপেক্ষা করার কারণ কী?
উত্তর: নোবেলজয়ী চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদা রচিত, নবারুণ ভট্টাচার্য অনূদিত ‘অসুখী একজন’ কবিতা থেকে প্রদত্ত অংশটি গৃহীত হয়েছে। কথক বিদায় নেওয়ার পর যে মেয়েটি দীর্ঘদিন প্রতীক্ষার প্রহর গুনে আসে শেষের পরিচয় দিয়েছিল, এখানে সেই মেয়েটির কথা বলা হয়েছে। কথক বিদায় নেওয়ার পর মেয়েটি জানত না, এ যাত্রাই কথকের শেষ যাওয়া। এরপর যুদ্ধ আসে। যুদ্ধের সর্বগ্রাসী অভিশাপ জাগতিক সবকিছুকে ধ্বংস করলেও, মেয়েটির হৃদয়ের ভালোবাসাকে স্পর্শ করতে পারে না। তাই সর্বহারার মহাশ্মশানে দাঁড়িয়েও মৃত্যুহীনা মেয়েটি তার প্রিয়জনের প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে থাকে। জাগতিক সবকিছুই নশ্বর, একমাত্র ভালোবাসা অবিনশ্বর। প্রকৃতপক্ষে মেয়েটি ছিল ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক। শাশ্বত ভালোবাসার মৃত্যু হয় না। যুদ্ধের কঠিন ভালোবাসার সম্মুখীনতার কাছে হার মানে। তাই যুদ্ধের আগুন মেয়েটিকে স্পর্শ করতে পারেনি। অপেক্ষারতা মেয়েটিরও মৃত্যু হয়নি।
২. “একটা কুকুর চলে গেল, হেঁটে গেল গির্জার এক নান/একটা সপ্তাহ আর একটা বছর কেটে গেল।” এই বর্ণনার মধ্য দিয়ে বক্তা কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: প্রখ্যাত চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতায় এই উক্তির মধ্য দিয়ে কথক বোঝাতে চেয়েছেন সময় প্রবহমান, সে কখনো থেমে থাকে না। কোনো একজনের অনুপস্থিতিতে জীবনের গতি রুদ্ধ হয় না। প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনাবলি ঘটে চলে নির্দিষ্ট নিয়মে। রাস্তা দিয়ে যেমন কুকুর চলে যায়, তেমনি হেঁটে যায় গির্জার নান। অর্থাৎ প্রবহমান সময় সমস্ত স্মৃতিচিহ্নটুকু মুছে দেয়।
৩. ‘সব চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে’-কীসের প্রভাবে সব চূর্ণ হয়ে গেল? কী কী চূর্ণ হল এবং আগুনে জ্বলে গেল?
উত্তর: নোবেলজয়ী চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদা রচিত, নবারুণ ভট্টাচার্য অনূদিত ‘অসুখী একজন’ কবিতা থেকে প্রদত্ত অংশটি গৃহীত হয়েছে। যুদ্ধের ধ্বংসলীলার প্রভাবে সবকিছু চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কথকের মিষ্টি বাড়ি, বারান্দার ঝুলন্ত বিছানা, গোলাপি গাছ, চিমনি, প্রাচীন জলতরঙ্গ সবই চূর্ণ হয়ে যায় যুদ্ধের দাপটে, জ্বলে যায় যুদ্ধের আগুনে।
৪. “সেই মিষ্টি বাড়ি, সেই বারান্দা”, মিষ্টি বাড়িটির পরিবেশ কেমন ছিল? অথবা, “যেখানে আমি ঝুলন্ত বিছানায় ঘুমিয়েছিলাম;” কবি যেখানে ঘুমিয়েছিলেন সেখানকার পরিবেশ কেমন ছিল? অথবা, ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কবির স্বপ্নবিজড়িত বাড়ির পরিবেশটি কেমন ছিল?
উত্তর: ‘অসুখী একজন’ কবিতায় চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদা তাঁর স্বপ্নবিজড়িত বাড়ির সুন্দর পরিবেশ ফুটিয়ে তুলেছেন। কবির মিষ্টি বাড়িটির বারান্দায় ছিল ঝুলন্ত বিছানা, যেখানে তিনি ঘুমাতেন। বারান্দার পাশে ছিল গোলাপি গাছ, ছড়ানো করতলের মতো পাতা, চিমনি এবং প্রাচীন জলতরঙ্গ।
৫. ধুয়ে দিল আমার পায়ের দাগ” কে ধুয়ে দিল? কবি একথার মধ্য দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন? অথবা, এর তাৎপর্য কী?
উত্তর: প্রখ্যাত চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কবির পায়ের দাগ ধুয়ে দিল বৃষ্টির জল। বৃহত্তর সমাজ ও পৃথিবীর দাবি কখনো কখনো মানুষকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করে। ব্যক্তিগত ভয়ানক বিপ্লবের পথকেই সে নিজের পথ বলে ভেবে পা বাড়ায়। চেনা পৃথিবী, প্রিয় মানুষ সব কিছুকে পিছনে ফেলে সে এগিয়ে যায় চূড়ান্ত সংগ্রামের লক্ষ্যে। সাংসারিক পৃথিবীতে ক্রমশ ধূসর হয়ে যায় মানুষটির স্মৃতি। প্রশ্নোদ্ধৃত মন্তব্যে কবি একথাই বোঝাতে চেয়েছেন।
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান – ৫)
১. ‘তারপর যুদ্ধ এল!’-‘তারপর’ বলতে কখন? যুদ্ধের পরিণতি কী হয়েছিল? অথবা ‘সমস্ত সমতলে ধরে গেল আগুন’সমতলে কেন আগুন ধরেছিল? তার পরিণতি কী হয়েছিল? অথবা ‘যেখানে ছিল শহর,/ সেখানে ছড়িয়ে রইল কাঠ কয়লা।’শহর কীভাবে কাঠ কয়লায় রূপান্তরিত হয়েছিল তা কবিতা অনুসারে আলোচনা করো। কবিতা অনুসারে শহরের সেই পরিস্থিতির বিবরণ দাও। অথবা ‘আমি তাকে ছেড়ে দিলাম….দূরে’-কথক চলে যাওয়ার পরের ঘটনাক্রম বর্ণনা করো।
উত্তর: নোবেলজয়ী চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদা রচিত, নবারুণ ভট্টাচার্য অনূদিত ‘অসুখী একজন’ কবিতার কথক তাঁর প্রিয়ার বাহুডোর পরিত্যাগ করে পা বাড়িয়েছিলেন অনিশ্চিত কর্তব্যের জগতে অথচ এই হৃদয়বিদারক সত্যটি কথকের প্রিয়তমার কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল। তাই প্রিয়জন বিদায় নেওয়ার পর, অপেক্ষার চোরাবালিতে প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে থাকা মেয়েটির দুটি চোখ দেখেছে কীভাবে সময়ের হাত ধরে বয়ে চলেছে সপ্তাহ-মাস-বছর। পাথরের মত ভারী ও নিষ্ঠুর বছরগুলি ক্রমাগত দুঃসহনীয় পাষাণভার নিয়ে নেমে এসেছিল মেয়েটির মাথার ওপর। বিষাদ ভালোবাসা বুকে নিয়ে অপেক্ষামানা মেয়েটির দুঃসহ প্রতীক্ষার দিনগুলির পরবর্তী সময়কে বোঝাতে ‘তারপর’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
(ক) যুদ্ধের আগমন: রক্তের আগ্নেয় পাহাড়ের মতো রক্ত বর্ণ ধারণ করতে করতে, অতর্কিতে একদিন সমতল ভূমির বুকে আছড়ে পড়ে যুদ্ধ। “তারপর যুদ্ধ হল/রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো।”
(খ) যুদ্ধের তাণ্ডব: সর্বগ্রাসী যুদ্ধের কথামতো শান্ত নিস্তরঙ্গ শহরের বুকে নেমে আসে ঘূর্ণিঝড়ের মতো। এমনকি কথকের শৈশব স্মৃতি বিজড়িত সমস্ত চিহ্নগুলি পর্যন্ত চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। “সব চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে।”
(গ) যুদ্ধের পরিণতি: যুদ্ধ শেষে গোটা প্রাণচঞ্চল শহর কাঠ কয়লায় ঘেরা শ্মশানভূমিতে পরিণত হয়। চারিদিকে ছড়িয়ে থাকে দোমড়ানো লোহা, মূর্তির মাথা, আর রক্তের নিকষ কালো দাগ। “যেখানে ছিল শহর/সেখানে ছড়িয়ে রইল কাঠ কয়লা………..একটা কালো দাগ।”
(ঘ) ভালোবাসার কাছে যুদ্ধের পরাজয়: যুদ্ধের তাণ্ডবে জাগতিক সবকিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও; অপেক্ষারতা মেয়েটির হৃদয়ের ভালোবাসাকে যুদ্ধ স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি। সে যেন ঈশ্বর প্রমাণিত ভালোবাসার মূর্ত রূপ। তাই তো সর্বহারার মহাশ্মশানে হৃদয়ের ভালোবাসার অনির্বাণ দীপশিখাকে প্রজ্বলিত করে আর তাকে আমরণ তুয়া নিয়ে, প্রিয়জনের প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে শ্রান্ত যুগজয়ী মৃত্যুহীনা মেয়েটি।
২. “যেখানে ছিল শহর/সেখানে ছড়িয়ে রইল কাঠকয়লা।” ‘অসুখী একজন’ কবিতা অবলম্বনে শহরের এই পরিণতি কীভাবে হলো তা লেখো।
উত্তর: চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদা ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যুদ্ধের অবস্থা বোঝাতে আলোচ্য পঙক্তিগুলি ব্যবহার করেছেন। কবিতার কথক তাঁর প্রিয়তমা নারীকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে বাধ্য হলেন। অপেক্ষারত নারীটি জানত না তিনি আর ফিরে আসবেন না। এরপর যুদ্ধ শুরু হলো দেশে। যুদ্ধের ভয়াবহতা পাহাড়-পর্বত ছাপিয়ে সমতলভূমিতে আগুন ধরিয়ে দিল এবং শিশু সহ অনেক মানুষ খুন হলো। হাজার বছর ধরে যেসব দেবতা ধ্যানমগ্ন ছিল তারা টুকরো টুকরো হয়ে উলটে পড়ল মন্দির থেকে। কথকের ঝুলন্ত বিছানা, গোলাপি গাছ, চিমনি, প্রাচীন জলতরঙ্গ সব চূর্ণ হয়ে জ্বলে গেল আগুনে। যেখানে দেখা গেল দোমড়ানো লোহা ও মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা। সেই যুদ্ধ এমনই ‘মর্মান্তিক রূপ’ নিল যে শান্ত সুন্দর গতিশীল শহর শ্মশানভূমিতে পরিণত হলো। শ্মশানে যেভাবে চিতার কাঠকয়লা ছড়িয়ে পড়ে থাকে, সেইভাবে শহরেরও ছড়িয়ে রইল কাঠকয়লা।
৩. “আমি তাকে ছেড়ে দিলাম”-‘আমি’র বেদনা ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কীভাবে চিত্রিত হয়েছে?
উত্তর: বিখ্যাত চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদার ‘Extravagaria’ গ্রন্থ থেকে গৃহীত ও নবারুণ ভট্টাচার্য অনূদিত ‘অসুখী একজন’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতাংশটি নেওয়া হয়েছে। এখানে ‘আমি’ হলেন কবিতার কথক। ঘর-পরিবার-জন্মভূমির সঙ্গে মানুষের নাড়ির টান কখনো কখনো অনিবার্যতা এসে ছিন্ন করে দেয়। আলোচ্য কবিতায় কথক যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নেওয়ার সময় অপেক্ষায় রেখে গিয়েছিলেন প্রিয় নারীকে। বিচ্ছেদের বেদনা তাকে কাতর করেছিল। ফিরে আসতে না পারায় সেই বেদনা আরও ঘনীভূত হয়। অথচ সময়ের স্রোতে সপ্তাহ ঘুরে বছর আসে এবং এভাবেই একসময় মুছে যায় তাঁর পদচিহ্ন- “বৃষ্টিতে ধুয়ে দিল আমার পায়ের দাগ/ঘাস জন্মালো রাস্তায়।” তারপর একদিন ভয়াবহ যুদ্ধ আসায় সমস্ত সমতলে ধরে গেল আগুন। কথকের সুন্দর আশ্রয় বাড়ি, বারান্দা, গোলাপি গাছ, প্রাচীন জলতরঙ্গ সব চূর্ণ হয়ে জ্বলে গেল আগুনে। দোমড়ানো লোহা, ভগ্ন মূর্তি, রক্তের দাগে শহর জুড়ে ধ্বংসের চিহ্ন ছড়িয়ে রইল। আর এই ধ্বংসের মধ্যে কথকের ফিরে আসার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে সেই মেয়েটি। কথক জানেন তিনি হয়তো কোনোদিনই ফিরতে পারবেন না তাঁর প্রিয়তমা নারীটির কাছে। নারীটির অপেক্ষার মতো কথকের অন্তরেও বেদনা বিরাজ করতে থাকল। এভাবেই আলোচ্য কবিতায় বেদনা চিত্রিত হয়েছে।
৪. ‘অসুখী একজন’ কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু লেখো।
উত্তর: দক্ষ রাজনীতিবিদ ও প্রখ্যাত চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদা লেখা ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কবি তাঁর প্রিয়তমাকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে অনেক দূরে চলে গেছেন। ধীরে ধীরে বৃষ্টি এসে কবির পায়ের দাগ ধুয়ে দিয়েছে, রাস্তায় নতুন ঘাস জন্মেছে। কবির দূরে যাওয়ার পর তাঁর প্রিয়তমার মাথার উপর পাথরের মতো বছরগুলি নেমে এসেছে। এভাবে একটা পর একটা বছর কেটে যাওয়ার পর সে ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেকথা বোঝাতে গিয়েই কবি ‘তারপর’ কথাটি ব্যবহার করেছেন। কবির প্রিয় স্বদেশভূমি রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছিল। এজন্য কবির কাছে যুদ্ধ ছিল ‘রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো।” যুদ্ধের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে শিশু ও সাধারণ মানুষকে। যুদ্ধের তাণ্ডবে বাড়িঘর সবই ধ্বংস হয়েছিল। ধ্যানমগ্ন দেবতাদের প্রতিমূর্তি উলটে পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। যুদ্ধের ছোবল থেকে বাদ পড়ল না কবির প্রিয় সুন্দর বাড়ি এবং বারান্দার ঝুলন্ত বিছানা, গোলাপি গাছ, চিমনি, প্রাচীন জলতরঙ্গ পর্যন্ত। কবি দেখালেন যে যুদ্ধ শুধু মানুষের প্রাণ নেয় না, মানুষের মনের বিপর্যয় ঘটাতেও সক্ষম। তাই তিনি বললেন- “যেখানে ছিল শহর/সেখানে ছড়িয়ে রইল কাঠকয়লা/দোমড়ানো লোহা, মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা/রক্তের একটা কালো দাগ” কবির স্মৃতিচিহ্নগুলি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। সমস্ত ক্ষতির মাঝে “রক্তের একটা কালো দাগ” মানুষের মনকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দেয়। এভাবেই কবির বর্ণনায় পাঠ্য কবিতায় যুদ্ধের মর্মান্তিক পরিণতি ফুটে উঠেছে। আর কবির জন্য দরজায় অপেক্ষারত নারীটিকে তেমনই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল।
৫. “শিশু আর বাড়িরা খুন হল/ সেই মেয়েটির মৃত্যু হল না।” মেয়েটি কে? কোন প্রসঙ্গে এই বক্তব্য? বক্তব্যটির তাৎপর্য লেখো। অথবা, “আর সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়”- মেয়েটি কে? উক্তিটির দ্বারা কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: পাবলো নেরুদা প্রণীত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় মেয়েটি হলো কবির প্রিয়তমা। দরজার সামনে অনন্ত প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে কবির প্রিয়তমা। কবি তাকে দাঁড় করিয়ে চলে এসেছিলেন। দূরে চলে যাওয়ার কবি সেখান থেকে ফিরতে পারেননি। কবির কর্মতৎপরতা এতটাই বিস্তৃতি পেয়েছিল যে সেই দায়বদ্ধতা থেকে তিনি পিছিয়ে আসতে পারেননি। কবির প্রিয়তমা অবশ্য কখনোই অনুমান করেননি যে কবি আর কখনোই ফিরে আসবেন না। সময়ের স্রোত ধারায় অপেক্ষার বছরগুলি কেটে যায়। বৃষ্টির ধারা কবির পথচলা পায়ের চিহ্ন মুছে দেয়। ঘাস জন্ম নেয় পথের বুকে। একের পর এক অনন্ত পাষাণময় বছরগুলো চেপে বসে কবির প্রিয়তমার বুকে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামা বাজে। বাতাসে বারুদের গন্ধ, যুদ্ধবাজ দেশগুলি মারন অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসে। তাদের হাত থেকে শিশুরাও রক্ষা পায় না। ঘরবাড়ি-মাঠ-মন্দির সবকিছু ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। কবি লেখেন, সেই সর্বাত্মক ধ্বংস ও মৃত্যুপুরীর মধ্যেও তাঁর প্রিয়তমা অনন্ত প্রতীক্ষা নিয়ে বেঁচে থাকে। সমস্ত ভাঙনের মধ্যে কবিপ্রিয়া হয়ে ওঠে একমাত্র প্রাণের প্রতীক। যুদ্ধের বিধ্বংসী আগ্নেয় অস্ত্রে মন্দিরের দেবতা পর্যন্ত মন্দির থেকে বেরিয়ে এল বাইরে; কবির স্বপ্নের বাসভূমি যেন চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে। তখনও সেই মেয়েটি, অসম্ভব প্রাণশক্তি নিয়ে কবির প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে।