মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য, জয় গোস্বামীর লেখা ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটি বাংলা সিলেবাসের একটি অপরিহার্য অংশ। এই কবিতায় যুদ্ধ ও হিংসার বিপরীতে শিল্পের শান্তির বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিকে সহজ করতে, আমরা এই পোস্টে ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতা থেকে খুঁটিয়ে তৈরি করা সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ MCQ এবং SAQ প্রশ্ন ও উত্তরগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নোত্তরগুলি অনুশীলন করলে তোমরা পরীক্ষায় অবশ্যই ভালো ফল করতে পারবে।
অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান (জয় গোস্বামী) – সম্পূর্ণ প্রশ্ন উত্তর ও সাজেশন | দশম শ্রেণী বাংলা MCQ & SAQ
অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান
জয় গোস্বামী
‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটি কোন কবির লেখা?
উঃ- জয় গোস্বামীর লেখা।
কবি জয় গোস্বামীর জন্ম সাল উল্লেখ করো।
উঃ- ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ নভেম্বর।
জয় গোস্বামীর জন্মস্থান কোথায়?
উঃ- কলকাতায়।
জন্মের পরে কবি পরিবারের সঙ্গে কোথায় বাস করতেন?
উঃ- নদীয়া জেলার রানাঘাটে।
কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে কবি জয় গোস্বামীর কবিতা লেখার সূত্রপাত হয়?
উঃ- সিলিং পাখাকে কেন্দ্র করে।
সিলিং পাখাকে কেন্দ্র করে কবি কত বছর বয়সে কবিতা লেখেন?
উঃ- মাত্র ১৩ বছর বয়সে।
জয় গোস্বামীর প্রথম কবিতা মুদ্রিত হয় কত বছর বয়সে?
উঃ- ১৯ বছর বয়সে।
কবির প্রথম কবিতা কোন কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়?
উঃ- সীমান্ত সাহিত্য, পদক্ষেপ, হোমশিখা – এই তিনটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
জয় গোস্বামীর প্রথম কবিতা সংকলন গ্রন্থের নাম কী?
উঃ- ‘ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ’ (১৯৭৭)।
জয় গোস্বামী কত খ্রিস্টাব্দে আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন?
উঃ- ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে ‘ঘুমিয়েছ ঝাউপাতা?’ কাব্যগ্রন্থের জন্য আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন।
কত খ্রিস্টাব্দে কবি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন?
উঃ- ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ‘বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি খাতা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
কবি কত খ্রিস্টাব্দে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেন?
উঃ- ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ‘পাতার পোশাক’ কাব্যগ্রন্থের জন্য কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেন।
‘পাগলী তোমার সঙ্গে’ কাব্যগ্রন্থটির জন্য কবি কোন পুরস্কার লাভ করেন?
উঃ- ২০০০ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
কত খ্রিস্টাব্দে কবি জয় গোস্বামী উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট সম্মান লাভ করেন?
উঃ- ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে।
২০১৪ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে পঞ্চম মুম্বাই ইন্টারন্যাশনাল লিটারারি ফেস্টিভ্যালে গিয়ে কবি কোন সম্মান পান?
উঃ- পোয়েট লরিয়েট’ সম্মান।
কবি জয় গোস্বামী রচিত কাব্যগ্রন্থ
প্রত্নজীব (১৯৭৮), আলেয়াহ্রদ (১৯৮১), উন্মাদের পাঠক্রম (১৯৮৬), ভূতুম ভগবান (১৯৮৮), ঘুমিয়েছ ঝাউপাতা? (১৯৮৯), আজ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করো (১৯৯১), গোল্লা (১৯৯১), পাগলী তোমার সঙ্গে (১৯৯৪), বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি খাতা (১৯৯৫), পাখি, হুস (১৯৯৫), ওঃ স্বপ্ন (১৯৯৬), পাতার পোশাক (১৯৯৭), বিষাদ (১৯৯৮), মা নিষাদ (১৯৯৯), তোমাকে আশ্চর্যময়ী (১৯৯৯), সূর্য পোড়া ছাই (১৯৯৯), জগৎবাড়ি (২০০০), হরিণের জন্য একক (২০০২), সন্তান-সন্ততি (২০০৮), বিকেলবেলার কবিতা (২০০৮), মৌতাত মহেশ্বর (২০০৫), সন্ধ্যা ফেরি ও অন্যান্য কবিতা (২০০৬), আমার শ্যামশ্রী ইচ্ছে (২০০৭), আমার স্বগতা ইচ্ছে গুলি (২০০৭), শাসনের প্রতি (২০০৭), ভালোটি বাসিব (২০০৮), শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০০৮), আত্মীয়-স্বজন (২০১০), ফুল গাছে কি ধুলো (২০১১)।
‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটির উৎস কী?
উঃ- ‘পাতার পোশাক’ (১৯৯৭) কাব্যগ্রন্থ।
‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটি ‘পাতার পোশাক’ কাব্যগ্রন্থের কত সংখ্যক কবিতা?
উঃ- ২০ সংখ্যক কবিতা।
অস্ত্র বলতে সাধারণত কী বোঝায়?
উঃ- হাতিয়ারকে বোঝায়।
‘গান’ শব্দের অর্থ কী?
উঃ- গীতি/গীত।
‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ এখানে ‘বিরুদ্ধ’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ কী?
উঃ- বিপরীতে।
‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কত লাইন বিশিষ্ট কবিতা?
উঃ- ১৮ লাইন বিশিষ্ট কবিতা।
‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটিতে কয়টি স্তবক রয়েছে?
উঃ- তিনটি।
কোন লাইনের মধ্য দিয়ে ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটি শুরু হয়েছে?
উঃ- অস্ত্র ফ্যালো, অস্ত্র রাখো পায়ে।’
কবি অস্ত্র ফেলে কোথায় রাখতে বলেছেন?
উঃ- পায়ে।
কবি কেমন ভাবে এগিয়ে আসেন?
উঃ- কবি হাজার হাতে পায়ে এগিয়ে আসেন।
কবি হাত নাড়িয়ে কী তাড়ান?
উঃ- বুলেট তাড়ান।
কবি কীসের বর্ম গায়ে পড়েছেন?
উঃ- গানের বর্ম।
‘বর্ম’ কথার অর্থ কী?
উঃ- অস্ত্রের আঘাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শরীরের আবরণ/সাঁজোয়া/কবজ।
কবি কতগুলি গান জানেন?
উঃ- একটা দুটো।
কবি গানকে কীসের সাথে তুলনা করেছেন?
উঃ- খড় কুটোর সাথে।
কবি কোথায় রক্ত মোছেন?
উঃ- গানের গায়ে।
মাথায় কোন দুটি পাখি আছে বলে কবিতায় জানা গেছে?
উঃ- শকুন বা চিল।
শকুন বা চিলকে কাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে?
উঃ- স্বার্থান্বেষী হিংস্র মানুষদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার।
কবির কাছে কোন পাখি আছে?
উঃ- একটা কোকিল আছে।
কবির একটা কোকিল কীভাবে গান বাঁধবে?
উঃ- সহস্র উপায়ে গান বাঁধবে।
কবিতায় কবি বর্ম খুলে কীভাবে দেখতে বলেছেন?
উঃ- আদুড় গায়ে দেখতে বলেছেন।
‘আদুড় গায়ে’ – বলতে কী বোঝ?
উঃ- খালি গায়ে।
‘গান দাঁড়াল _‘ – শূন্যস্থানের সঠিক শব্দ বসাও।
উঃ- ঋষিবালক।
ঋষি বালকের মাথায় কী গোঁজা আছে?
উঃ- ময়ূর পালক।
কবিতায় ঋষিবালক কীসের প্রতীক?
উঃ- সত্য – নিষ্ঠা এবং মানবতার প্রতীক।
‘তোমায় নিয়ে বেড়াবে গান’-গান কোথায় নিয়ে বেড়াবে?
উঃ- নদীতে, দেশ গাঁয়ে।
‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতার শেষ লাইনে কবি অস্ত্র ফেলে কোথায় রাখতে বলেছেন?
উঃ- গানের দুটি পায়ে।
বুলেট কী?
উঃ- বন্দুকের গুলি।
‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতায় বর্ণিত ‘আমি’ কে?
উঃ- কবি।
‘আঁকড়ে’ – শব্দটির অর্থ কী?
উঃ- জড়িয়ে।
কবিতায় ঋষি বালক কী হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে?
উঃ- পরিত্রাতা হিসাবে।
অস্ত্র পায়ে রাখার তাৎপর্যটি লেখো।
উঃ- কবি হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, লড়াই ভুলে মানবতার জয়গান ঘোষণা করতেই অস্ত্র পায়ে রাখতে বলেছেন।
হাজার হাতে পায়ে এগিয়ে আসা বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উঃ- হাজার হাজার মানুষের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধকে বোঝানো হয়েছে।
‘গানের বর্ম আজ পড়েছি গায়ে’ – এ কথা বলার কারণ কী?
উঃ- বিশ্বব্যাপী হানাহানি, রক্তক্ষয়, হিংসা এবং হিংস্রতাকে কবি গানের দ্বারা জয় করতে চেয়েছেন বলেই গানকে হাতিয়ার করে উক্ত কথাটি বলেছেন।
‘আঁকড়ে ধরে সে খড়কুটো’ ‘খড়’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উঃ- খড়কুটো’ বলতে ঘাস বা বিচালি জাতীয় এক ধরনের তুচ্ছ জিনিসকে বোঝায়। আলোচ্য কবিতায় কবি ‘খড়কুটো’ বলতে দিশেহারা মানুষের মুক্তির সামান্য অবলম্বনে বুঝিয়েছেন।
‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতায় কবি কোকিলকে ব্যবহার করেছেন কেন?
উঃ- কোকিল হলো বসন্তের অগ্রদূত এবং তারুণ্য মাধুর্যের প্রতীক। তাই ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতায় হিংসাকে জয় করতে মাধুর্য ও তারুণ্যের প্রতীক হিসাবে কোকিল পাখিকে ব্যবহার করেছেন।
‘বর্ম খুলে দেখো আদুড় গায়ে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উঃ- আলোচ্য অংশটির মধ্য দিয়ে কবি ক্ষমতা, বিদ্বেষ, অহংকার, লোভ, মোহ প্রভৃতি ত্যাগ করে দেখতে বলেছেন।
কবি কোকিলকে কেন সহস্র উপায়ে গান বাঁধতে বলেছেন?
উঃ- অহংকার এবং অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কৌশল প্রয়োজন। মূলত এটি বোঝাতেই আলোচ্য উক্তিটি করা হয়েছে।
‘হাত নাড়িয়ে বুলেট তাড়়াই’- কবি কেন এ কথা বলেছেন?
উঃ- আলোচ্য উক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি হিংস্রতা এবং দানবীয় অত্যাচারকে অবজ্ঞা করে সাহসিকতা ও মানবিকতার কাঁধে ভর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথাই বলতে চেয়েছেন।
‘মাথায় কত শকুন বা চিল’- শকুন বা চিল শব্দ দুটি কী কী অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে?
উঃ- শকুন এবং চিল দুটি হিংস্র মাংসাশী পাখি। এই দুটি শব্দের দ্বারা কবি মূলত ক্ষমতালিপ্সু, সুযোগ সন্ধানী ও হিংস্র মানুষদের বুঝিয়েছেন।
রচনামূলক প্রশ্ন উত্তর সমূহ
১) “আমার শুধু একটা কোকিল/গান বাঁধবে সহস্র উপায়ে”-‘শুধু একটা কোকিল’ আসলে কী? এই গান বাঁধার প্রয়োজনীয়তাই বা কী? ২+৩
উত্তর:
‘শুধু একটা কোকিল’-এর স্বরূপ: জয় গোস্বামী তাঁর ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতায় পৃথিবী জুড়ে চলতে থাকা হিংসা ও হানাহানির প্রতিবাদ করেছেন। মাথার ওপরে ‘শকুন’ এবং ‘চিল’ অর্থাৎ যুদ্ধবাজ শক্তিকে দেখেও ভরসা রেখেছেন নিজের শুভবোধে, যা সামাজিক বিশৃঙ্খলা, ধ্বংস এবং হত্যার উন্মাদনাকে রোধ করতে পারে। এই শুভবোধ এবং সৃজনশীল সত্তাকেই কবি ‘শুধু একটা কোকিল’ বলে অভিহিত করেছেন।
গান বাঁধার প্রয়োজনীয়তা: ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কবি সৃষ্টিকেই প্রতিরোধের একমাত্র উপায় করে তুলতে চেয়েছেন। সৃজনশীলসত্তারই আনন্দময় প্রকাশ হল সংগীত। এই সংগীতই তার অপূর্ব আবেশের মাধ্যমে মানুষকে পৃথিবীর যাবতীয় জ্বালা, যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়, ভুলিয়ে দেয় সভ্যতার ওপরে নেমে আসা অস্ত্রের অভিশাপ। যেসব যুদ্ধপ্রিয় বন্দুকবাজরা পৃথিবীকে ধ্বংস করতে চায়, তাদের আগ্রাসী হিংসার ওপরে শান্তির এক প্রলেপ দিয়ে যায় সংগীত। তাই গানকে কবি ব্যবহার করেছেন অস্ত্রের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে। ‘গানের বর্ম’ পরে কবি সহজেই বুলেটকে প্রতিহত করতে পারেন। এই গানই তাঁকে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত করে। তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার, উঠে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়। যাবতীয় রক্তাক্ততাকে ভুলে যেতে সাহায্য করে এই গান। এই কারণেই সহস্র উপায়ে গান বাঁধা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।
২) ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতার মূল বক্তব্য নিজের ভাষায় লেখো। অথবা, ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটিতে কবির যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের যে প্রকাশ ঘটেছে তা নিজের ভাষায় বিবৃত করো।
উত্তর:
শুরুর কথা: জয় গোস্বামী তাঁর ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতায়, অস্ত্রশক্তি এবং পৈশাচিক শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের সুস্থ রুচি ও নান্দনিকতার প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলেছেন।
হাতিয়াররূপে গান: অস্ত্রকে প্রতিহত করতে গানকে হাতিয়ার করে তুলেছে মানুষ। গানকে অবলম্বন করে কবি সেই বিপুল শক্তির অধিকারী হয়েছেন যা তাঁকে বুলেট প্রতিহত করার ক্ষমতা দিয়েছে।
ঐক্যের বন্ধন: গান তাঁকে এক আশ্চর্য ঐক্যবোধে বেঁধেছে। তাই তাঁর হাতে হাত মিলিয়েছে আরও হাজার মানুষ, পায়ে পা মিলিয়েছে হাজার পা। দৃঢ় ভঙ্গিতে কবি বলতে পেরেছেন-“অস্ত্র ফেলো, অস্ত্র রাখো পায়ে।”
প্রতীকরূপে গান: পৃথিবীর ইতিহাসে অস্ত্র কখনও শেষকথা বলেনি। জয়ী হয়েছে মানুষের শুভবুদ্ধি, একতা ও সৃজনশীলতা। গান এই কবিতায় এসবেরই প্রতীক। গানই কবিকে মানুষের সঙ্গে মিলিয়েছে, রক্ত মুছিয়ে সুন্দরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। গানের নানা রূপ, নানা বিষয়, তার সুরের নানা বৈচিত্র্য। কখনও সে হয়ে ওঠে ঋষিবালকের মতো স্নিগ্ধ, নিষ্পাপ কখনও বা তার ছোঁয়ায় লেগে থাকে কোকিলের মোহময় সুরেলা সৃষ্টি।
অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান: যুদ্ধবাজ মানুষ অস্ত্র হাতে মনুষ্যত্বের বিপক্ষে গিয়ে যখন দাঁড়ায়, তখন গানের বর্ম পরে কবি অস্ত্রকে সহজেই প্রতিহত করেন।
৩) “গানের বর্ম আজ পরেছি গায়ে” গানের বর্ম পরার প্রয়োজনীয়তা কী তা ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটি অবলম্বনে আলোচনা করো? অথবা, গান কীভাবে অস্ত্রের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে তা ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতা অবলম্বনে লেখো? অথবা, “অস্ত্র ফেলো, অস্ত্র রাখো গানের দুটি পায়ে” অস্ত্রের বিরুদ্ধে গানকে কবি কীভাবে প্রতিষ্ঠা করছেন?
উত্তর:
শুরুর কথা: ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সৃষ্টিকেই প্রতিরোধের একমাত্র উপায় করে তুলতে চেয়েছেন কবি জয় গোস্বামী।
প্রতিবাদের হাতিয়ার: সংগীতের সুরেই মিলে যায় সহস্র কণ্ঠ। কখনও তা হৃদয়কে শুদ্ধ করার অবলম্বন, কখনও বা প্রতিবাদের হাতিয়ার। প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াইয়ে গানই মানুষকে জোগায় অসীম মনোবল, জোট বাঁধার সাহস।
অস্ত্রের বিরোধিতা: অস্ত্রের বিরুদ্ধে এই গানকে আঁকড়ে ধরেই কবি অনায়াসে হাত নাড়িয়ে বুলেট তাড়াতে পারেন। গানই সেই আশ্রয়, যা হিংসার অবসান ঘটাতে পারে। অজস্র হিংসার বিপরীতে একটা গানই হতে পারে কবির বা সৃজনশীল মানুষের নিজস্ব জবাব। গান কবির কাছে বর্ম, যা পরে বিরুদ্ধ শক্তির আক্রমণকে প্রতিহত করার শক্তি অর্জন করেন কবি।
নান্দনিক প্রতিরোধ: রক্তাক্ততার পথ ধরে অশুভ অকল্যাণকারী শক্তিকে প্রতিরোধ নয়, পরিবর্তে কবি তৈরি করতে চেয়েছেন এক নান্দনিক প্রতিরোধ।
আত্মশক্তির জাগরণ: হিংসা ও হানাহানির এই পৃথিবীতে গানের অসীম শক্তিই মানুষকে একত্রিত করে, আত্মশক্তিতে জাগিয়ে তোলে। এই শক্তিই কবিকে অনুপ্রাণিত করেছে গানের সামনে নতজানু হতে।
ইতিকথা: এভাবেই কবি গানকে হাতিয়ার করে উত্তরণের পথে এগিয়ে যেতে চেয়েছেন।
৪) ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো?
উত্তর: সাহিত্যে নামকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এই নামকরণ নানান দিক থেকে হতে পারে, কখনও বিষয়বস্তুকেন্দ্রিক, কখনও প্রতীকী বা চরিত্রধর্মী, কখনও বা তা ব্যঞ্জনধর্মী। আমাদের বিচার্য বিষয় জয় গোস্বামীর ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতাটির নামকরণ কতদূর সার্থক তা দেখা।
‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতার শিরোনামটি ব্যঞ্জনাবর্মী। কেননা, ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র’ এই স্বাভাবিক স্লোগানকে কবি বদলে দিয়ে এক বিশেষ বার্তা দিতে চেয়েছেন। কবিতার বিষয়বস্তু অবশ্যই যুদ্ধবিরোধী কিন্তু এই বিরোধিতার কৌশল আলাদা। কবিতার শুরুতেই কবি বলেছেন, “অস্ত্র ফেলো, অস্ত্র রাখো পায়ে।” অস্ত্র ফেলার মধ্য দিয়ে আর পাঁচ জন শান্তিকামী মানুষের মতোই কবি শান্তির জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। পায়ের কাছে অস্ত্র রাখার আহ্বান যুদ্ধবাজদের আত্মসমর্পণের দিকটিকেই বড়ো করে তোলে। গানকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে কবি সমস্ত অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চান। তাই অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান গাইতে গাইতেই কবি হাত নাড়িয়ে বুলেট তাড়াতে পারেন। অর্থাৎ গানের শান্তি দিয়ে তিনি অনায়াসে যুদ্ধ আর ধ্বংসকে রুখে দিতে পারেন। সমাজে যখন লোভী চিল-শকুন রূপ যুদ্ধবাজদের আনাগোনা, কবির সম্বল তখন শুধু একটা কোকিল যা আসলে মানুষের সৃজনশীল সত্তা। এই কোকিলই কবিকে হাজার উপায়ে গান বেঁধে দেবে। গানই ঋষিবালকের মতো পবিত্রতার প্রতীক হয়ে কবিকে তথা সমাজকে মনুষ্যত্বের পথ দেখাবে। তাই হিংসার বিরুদ্ধে হিংসা বা অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র নয়—যাবতীয় অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে গানকে বর্ম করে কবি সত্য ও শান্তিতে পৌঁছাতে চান। এই মূলভাবকে সামনে রেখে দেওয়া কবিতাটির নাম গভীর ব্যঞ্জনার ইঙ্গিত দেয়। তাই কবিতাটির নামকরণ সম্পূর্ণরূপে সংগত এবং যথাযথ।
৫) ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কীভাবে কবি জয় গোস্বামীকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কবিতা অবলম্বনে লেখো?
উত্তর:
শুরুর কথা: “যুদ্ধ মানে শত্রু শত্রু খেলা/যুদ্ধ মানে আমার প্রতি তোমার অবহেলা”—এ হল আধুনিক সভ্য পৃথিবীর বিবেকের কণ্ঠস্বর। যুদ্ধ মানবতার শত্রু। যুদ্ধই মানুষের ঐক্যবদ্ধ জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে, হিংসার বিষে বিষাক্ত করে তোলে সমাজসত্তাতাকে। এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পথে হেঁটে কবি জয় গোস্বামী পৃথিবীকে হিংসামুক্ত করতে চেয়েছেন।
অস্ত্রের বিরোধিতা: ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতায় কবি জয় গোস্বামী গানকে যুদ্ধ বিরোধিতার এক নতুন উপায়রূপে দাঁড় করিয়েছেন। সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ একসময় অস্ত্র দিয়েই অস্ত্রকে প্রতিরোধের পথ বেছে নিয়েছিল। কিন্তু এই পথও রক্তাক্ত, হিংস্রতায় ভরা। অন্যদিকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে গান শান্তির বার্তা বয়ে আনে। জয় গোস্বামী তাই গানের বর্ম পরেই অস্ত্রবিরোধী হতে চান।
সৃজনশীলতার জাগরণ: সৃজনশীলতাকে অবলম্বন করে মানবতাকে সুরক্ষিত করতে পারে গান। প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে শুভবুদ্ধি ও সৃজনশীলতা জাগলে এই যুদ্ধের রক্তে ভরা পৃথিবী আবার শান্ত ও সুন্দর হয়ে উঠবে। আমাদের রক্তভেজা সমাজে যদি গান এসে ঋষিবালক হয়ে দাঁড়ায়, তবে পৃথিবীর সব যুদ্ধবাজরা স্তব্ধ হয়ে যাবে।
ইতিকথা: এভাবেই কবি গানকে হাতিয়ার করে উত্তরণের পথে এগিয়ে যেতে চেয়েছেন।