‘বহুরূপী’ গল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলেন হরিদা – যিনি একাধারে অভিনেতা, শিল্পী ও সমাজ-পর্যবেক্ষক। তিনি কখনো পাগলের বেশে, কখনো সন্ন্যাসী রূপে, আবার কখনো পুলিশ বা বাইজি সেজে সাধারণ মানুষের জীবনে চমক সৃষ্টি করেন। তাঁর এই রূপান্তরশীল ক্ষমতা শুধু বিনোদনের জন্য নয়, বরং সমাজের দ্বিচারিতা, ভণ্ডামি এবং মানুষের আবেগকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বহুরূপী হরিদা একজন এমন মানুষ, যিনি নিজেকে ‘খাঁটি মানুষ’ ভাবতে সাহস পান না, কিন্তু মানুষের মুখোশ খুলে সত্য উন্মোচন করতে দ্বিধা করেন না। হরিদার চরিত্রে লুকিয়ে রয়েছে জীবনের গভীর বাস্তবতা, আত্মোপলব্ধি এবং নাটকীয় বৈচিত্র্য – যা এই গল্পকে করে তোলে পাঠকের মনে চিরস্থায়ী।
লেখক পরিচিতি
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ এক স্মরণীয় নাম। সাহিত্য জগতে তাঁর অনুপ্রবেশ ঘটেছিল বেশ কিছুটা দেরিতে। তিনি তাঁর মেধাশক্তি, চিন্তাচেনা এবং অভিজ্ঞতার দ্বারা বাংলা সাহিত্যকে বিভিন্ন কালজয়ী রচনার মধ্য দিয়ে ভরিয়ে তুলেছেন।
জন্ম ও শৈশব
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে ১৪ সেপ্টেম্বর বিহারের হাজারিবাগে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের বহর গ্রামে।
শিক্ষাজীবন
সুবোধ ঘোষ হাজারিবাগের সেন্ট কলম্বাস কলেজের ছাত্র ছিলেন। বিশিষ্ট দার্শনিক ও গবেষক মহেশ ঘোষের লাইব্রেরিতে তিনি পড়াশোনা করতেন। প্রত্নতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব, এমনকি সামরিকবিদ্যায় তাঁর যথেষ্ট দক্ষতা ছিল।
কর্মজীবন ও সাহিত্যজীবন
সুবোধ ঘোষের কর্মজীবন শুরু হয় বিহারের আদিবাসী অঞ্চলে বাসের কনডাক্টর হিসেবে। এরপর সার্কাসের ক্লাউন, মুম্বাই পৌরসভার চতুর্থ শ্রেণির কাজ, চায়ের ব্যবসা, বেকারির ব্যবসা, মালগুদামের স্টোরকিপার প্রভৃতি কাজে তিনি তাঁর জীবনের বেশ কিছুটা সময় ব্যয় করেন। বহু পথ ঘুরে তিরিশের দশকের শেষে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা-র রবিবাসরীয় বিভাগে সহকারী হিসেবে যোগ দেন। তাঁর লেখালেখির সময়কাল ১৯৪০ থেকে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট দাঙ্গাবিধ্বস্ত নোয়াখালিতে গান্ধিজির সহচর হিসেবে তিনি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন। দাঙ্গা এবং দাঙ্গা-পরবর্তী সময়ের সাম্প্রদায়িকতা, হিংস্রতা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। সুবোধ ঘোষের প্রথম গল্প ‘অযান্ত্রিক’। তাঁর আর-একটি বিখ্যাত গল্প ‘থির বিজুরি’। শুধু গল্পকার হিসেবে নয়, ঔপন্যাসিক হিসেবেও তিনি প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর লেখা একটি অন্যতম উপন্যাস হল তিলাঞ্জলি (১৯৪৪)। কংগ্রেস সাহিত্যসংঘের মতাদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর এই উপন্যাসে।
বিচিত্র জীবিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল তাঁর কর্মজীবন। আনন্দবাজার পত্রিকা-র সহকারী হিসেবে তিনি যোগ দেন। ক্রমে সেখানকার সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর এবং তারপর অন্যতম সম্পাদকীয় লেখক হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা হল- ‘ভারত প্রেমকথা’ (মহাভারতের গল্প অবলম্বনে রচিত), ‘গঙ্গোত্রী’ (১৯৪৭), ‘ত্রিযামা’ (১৯৫০), ‘ভালোবাসার গল্প’, ‘শতকিয়া’ (১৯৫৮) প্রভৃতি। এ ছাড়াও তাঁর কয়েকটি গল্পসংকলন হল-‘ফসিল’, ‘পরশুরামের কুঠার’, ‘জতুগৃহ’।
পুরস্কার
সুবোধ ঘোষ তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য আনন্দ পুরস্কার এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদক পান।
জীবনাবসান
১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ১০ মার্চ এই বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মারা যান।
উৎস
সুবোধ ঘোষের গল্পসমগ্র, তৃতীয় খণ্ড থেকে ‘বহুরূপী’ গল্পটি নেওয়া হয়েছে।
দশম শ্রেণির সমস্ত ছাত্র-ছাত্রী বন্ধুদের জন্য সুবোধ ঘোষের লেখা ‘বহুরূপী’ গল্পটি নিয়ে আমাদের আজকের এই স্পেশাল আলোচনা। আজকের এই খানে গোটা গল্পটা লাইন ধরে ধরে তোমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তোমরা যদি মনযোগ দিয়ে সম্পূর্ণ দেখো আমি নিশ্চিত গোটা গল্পটা তোমাদের কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং এই গল্প থেকে যে জায়গা থেকে যে প্রশ্নই করা হোক না কেন তোমরা তার উত্তর দিতে পারবে। এজন্য আজকের এই সম্পূর্ণ দেখো, শুরুতেই আমরা জেনে নেব ‘বহুরূপী’ কথাটির অর্থ কি। তোমরা আমায় বলতে পারো, যে রূপ বদলায় সেই বহুরূপী। উত্তরটা কিছুটা সঠিক। তোমাদের আমি জানিয়ে দিচ্ছি বহুরূপী কথার অর্থ কী। বহুরূপী এক ধরনের লোকশিল্প। যে লোকশিল্পীরা নানা রূপ ধারণ করে বা নানা রূপ বদল করে জীবিকা নির্বাহ করেন অর্থাৎ উপার্জন করেন, নিজের সংসার চালান, তাদেরই বলা হয় বহুরূপী। আমাদের আজকের গল্পে বহুরূপী ব্যক্তিটির নাম হল হরি। গল্পকথক বহুরূপী হরিকে আমাদের সামনে ‘হরিদা’ বলে সম্বোধন করেছেন। আমরা দেখতে পাব গল্পকথক আর তার দুই বন্ধু তারা মিলে হরিদার বাড়িতে গেছে। হরিদা তখন উনুন জ্বালিয়ে তাতে ভাতের হাড়ি চাপিয়েছেন।
হরিদার কাছে আমরাই গল্প করে বললাম, শুনেছেন, হরিদা, কী কাণ্ড হয়েছে? উনোনের মুখে ফুঁ দিয়ে আর অনেক ধোঁয়া উড়িয়ে নিয়ে হরিদা এইবার আমাদের কথার জবাব দিলেন—না, কিছুই শুনিনি।— জগদীশবাবু যে কী কাণ্ড করেছেন, শোনেননি হরিদা? হরিদা — না রে ভাই, বড়ো মানুষের কাণ্ডের খবর আমি কেমন করে শুনব? আমাকে বলবেই বা কে?
সাতদিন হলো এক সন্ন্যাসী এসে জগদীশবাবুর বাড়িতে ছিলেন। খুব উঁচু দরের সন্ন্যাসী। হিমালয়ের গুহাতে থাকেন। সারা বছরে শুধু একটি হরীতকী খান; এ ছাড়া আর কিছুই খান না। সন্ন্যাসীর বয়সও হাজার বছরের বেশি বলে অনেকেই মনে করেন।
হরিদা – সন্ন্যাসী কি এখনও আছেন? – না, চলে গিয়েছেন। আক্ষেপ করেন হরিদা — থাকলে একবার গিয়ে পায়ের ধুলো নিতাম।
– তা পেতেন না হরিদা! সে ভয়ানক দুর্লভ জিনিস। শুধু ওই একা জগদীশবাবু ছাড়া আর কাউকে পায়ের ধুলো নিতে দেননি সন্ন্যাসী। হরিদা — কেন? জগদীশবাবু একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরলেন। তখন বাধ্য হয়ে সন্ন্যাসী পা এগিয়ে দিলেন, নতুন খড়ম পরলেন আর সেই ফাঁকে জগদীশবাবু পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন। হরিদা – বাঃ, এ তো বেশ মজার ব্যাপার! হ্যাঁ, তা ছাড়া সন্ন্যাসীকে বিদায় দেবার সময় জগদীশবাবু একশো টাকার একটা নোট জোর করে সন্ন্যাসীর ঝোলার ভেতরে ফেলে দিলেন। সন্ন্যাসী হাসলেন আর চলে গেলেন। গল্প শুনে খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন হরিদা। অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। আমরা কী বলছি বা না বলছি, সেদিকে হরিদার যেন কান নেই।
হরিদার উনানের আগুন তখন বেশ গনগনে হয়ে জ্বলছে। আমাদের চায়ের জন্য এক হাঁড়ি ফুটন্ত জল নামিয়ে দিয়েই হরিদা তাঁর ভাতের হাঁড়িটাকে উনানে চড়ালেন। শহরের সবচেয়ে সরু এই গলিটার ভিতরে এই ছোট্ট ঘরটাই হরিদার জীবনের ঘর; আর আমাদের চারজনের সকাল-সন্ধ্যার আড্ডার ঘর। চা চিনি আর দুধ আমরাই নিয়ে আসি। হরিদা শুধু তাঁর উনানের আগুনের আঁচে জল ফুটিয়ে দেন। খুবই গরিব মানুষ হরিদা। কিন্তু কাজ করতে হরিদার প্রাণের মধ্যে যেন একটা বাধা আছে। ইচ্ছে করলে কোনো অফিসের কাজ, কিংবা কোনো দোকানের বিক্রয়ওয়ালার কাজ পেয়ে যেতে পারেন হরিদা; কিন্তু ওই ধরনের কাজ হরিদার জীবনের পছন্দই নয়। একেবারে ঘড়ির কাঁটার সামনে সময় বেঁধে দিয়ে আর নিয়ম করে নিয়ে রোজই একটা চাকরির কাজ করে যাওয়া হরিদার পক্ষে সম্ভব নয়। হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না। এই একঘেয়ে অভাবটাকে সহ্য করতে হরিদার আপত্তি নেই, কিন্তু একঘেয়ে কাজ করতে ভয়ানক আপত্তি। হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে। আর, সেটাই যে হরিদার জীবনের পেশা। হরিদা মাঝে মাঝে বহুরূপী সেজে যেটুকু রোজগার করেন, তাতেই তাঁর ভাতের হাঁড়ির দাবি মিটিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। মাঝে মাঝে সত্যিই উপোস করেন হরিদা। তারপর একদিন হঠাৎ আবার এক সকালে কিংবা সন্ধ্যায় বিচিত্র ছদ্মবেশে অপরূপ হয়ে পথে বের হয়ে পড়েন। কেউ চিনতে পারে না। যারা চিনতে পারে এক-আনা দু-আনা বকশিশ দেয়। যারা চিনতে পারে না, তারা হয় কিছুই দেয় না, কিংবা বিরক্ত হয়ে দুটো-একটা পয়সা দিয়ে দেয়। একদিন চকের বাসস্ট্যান্ডের কাছে ঠিক দুপুরবেলাতে একটা আতঙ্কের হল্লা বেজে উঠেছিল। একটা উন্মাদ পাগল; তার মুখ থেকে লালা ঝরে পড়ছে, চোখ দুটো কটকটে লাল। তার কোমরে একটা ছেঁড়া কম্বল জড়ানো, গলায় টিনের কৌটোর একটা মালা। পাগলটা একটা থান ইট হাতে তুলে নিয়ে বাসের উপরে বসা যাত্রীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছে। চেঁচিয়ে উঠছে যাত্রীরা, দুটো একটা পয়সা ফেলেও দিচ্ছে। একটু পরেই বাসের ড্রাইভার কাশীনাথ ধমক দেয়। —খুব হয়েছে হরি, এইবার সরে পড়ো। অন্যদিকে যাও। অ্যাঁ? ওটা কি একটা বহুরূপী? বাসের যাত্রীরা কেউ হাসে, কেউ বা বেশ বিরক্ত হয়, কেউ আবার বেশ বিস্মিত। সত্যিই, খুব চমৎকার পাগল সাজতে পেরেছে তো লোকটা।
হরিদার জীবন এইরকম বহুরূপের খেলা দেখিয়েই একরকম চলে যাচ্ছে। এই শহরের জীবনে মাঝে মাঝে বেশ চমৎকার ঘটনা সৃষ্টি করেন বহুরূপী হরিদা। সন্ধ্যার আলো সবেমাত্র জ্বলেছে, দোকানে দোকানে লোকজনের ব্যস্ততা আর মুখরতাও জমে উঠেছে। হঠাৎ পথের উপর দিয়ে ঘুঙুরের মিষ্টি শব্দ রুমঝুম করে বেজে-বেজে চলে যেতে থাকে। এক রূপসি বাইজি প্রায় নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছে। শহরে যারা নতুন এসেছে, তারা দুই চোখ বড়ো করে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু দোকানদার হেসে ফেলেন — হরির কাণ্ড। অ্যাঁ? এটা একটা বহুরূপী নাকি? কারও কারও মুগ্ধ চোখের মোহভঙ্গ হয়, আর যেন বেশ একটু হতাশস্বরে প্রশ্ন করে ওঠে। বাইজির ছদ্মবেশে সেদিন হরিদার রোজগার মন্দ হয়নি। মোট আট টাকা দশ আনা পেয়েছিলেন। আমরাও দেখেছিলাম, এক-একটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে সেই রূপসি বাইজি, মুচকি হেসে আর চোখ টিপে একটা ফুলসাজি এগিয়ে দিচ্ছে। দোকানদারও হেসে ফেলে আর একটা সিকি তুলে নিয়ে বাইজির হাতের ফুলসাজির উপর ফেলে দেয়। কোনোদিন বাউল, কোনোদিন কাপালিক। কখনও বোঁচকা কাঁধে বুড়ো কাবুলিওয়ালা, কখনও হ্যাট-কোট-প্যান্টলুন-পরা ফিরিঙ্গি কেরামিন সাহেব। একবার পুলিশ সেজে দয়ালবাবুর লিচু বাগানের ভিতরে দাঁড়িয়েছিলেন হরিদা; স্কুলের চারটে ছেলেকে ধরেছিলেন। ভয়ে কেঁদে ফেলেছিল ছেলেগুলো; আর স্কুলের মাস্টার এসে সেই নকল পুলিশের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন — এবারের মতো মাপ করে দিন ওদের। কিন্তু আটআনা ঘুষ নিয়ে তারপর মাস্টারের অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন সেই নকল-পুলিশ হরিদা। পরদিন অবশ্য স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের জানতে বাকি থাকেনি, কাকে তিনি আটআনা ঘুষ দিয়েছেন। কিন্তু মাস্টারমশাই একটুও রাগ করেননি। বরং একটু তারিফই করলেন — বা, সত্যি, খুব চমৎকার পুলিশ সেজেছিল হরি!
এবার আমরা ফিরে যাব মূল গল্পে। সেই গল্পকথক হরিদার বাড়িতে গিয়ে বললেন জগদীশবাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসীকে তিনি টাকা দিয়েছেন, তিনি সোনার বোল দেওয়া খড়ম পরিয়েছেন। হরিদা গম্ভীর হয়ে গেলেন। এবার তারপরের অংশ।
আজ এখন কিন্তু আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না, হরিদা এত গম্ভীর হয়ে কী ভাবছেন। সন্ন্যাসীর গল্পটা শুনে কি হরিদার মাথার মধ্যে নতুন কোনো মতলব ছটফট করে উঠেছে? ঠিকই, আমাদের সন্দেহ মিথ্যে নয়। হরিদা বললেন — আজ তোমাদের একটা জবর খেলা দেখাব। — আমাদের দেখিয়ে আপনার লাভ কি হরিদা? আমাদের কাছ থেকে একটা সিগারেটের চেয়ে বেশি কিছু তো পাবেন না। হরিদা — না, ঠিক তোমাদের দেখাব না। আমি বলছি তোমরা সেখানে থেকো। তাহলে দেখতে পাবে… —কোথায়? হরিদা — আজ সন্ধ্যায় জগদীশবাবুর বাড়িতে। —হঠাৎ জগদীশবাবুর বাড়িতে খেলা দেখাবার জন্য আপনার এত উৎসাহ জেগে উঠল কেন? হরিদা হাসেন — মোটা মতন কিছু আদায় করে নেব। বুঝতেই তো পারছ, পুরো দিনটা রূপ ধরে ঘুরে বেরিয়েও দু-তিন টাকার বেশি হয় না। একবার বাইজি সেজে অবিশ্যি কিছু বেশি পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু ওতেই বা কি হবে? ঠিকই বলেছেন হরিদা। সপ্তাহে বড়োজোর একটা দিন বহুরূপী সেজে পথে বের হন হরিদা। কিন্তু তাতে সাতদিনের পেট চলবার মতো রোজগার হয় না। হরিদা বলেন — নাঃ, এবার আর কাঙালের মতো হাত পেতে বকশিশ নেওয়া নয়। এবার মারি তো হাতি, লুঠি তো ভান্ডার। একবারেই যা ঝেলে নেব তাতে আমার সারা বছর চলে যাবে।
কিন্তু সে কী করে সম্ভব? জগদীশবাবু ধনী মানুষ বটেন, কিন্তু বেশ কৃপণ মানুষ। হরিদাকে একটা যোগী সন্ন্যাসী কিংবা বৈরাগী সাজতে দেখে কত আর খুশি হবেন জগদীশবাবু? আর খুশি হলেই বা কত আনা বকশিশ দেবেন। পাঁচ আনার বেশি তো নয়। হরিদা বলেন — তোমরা যদি দেখতে চাও, তবে আজ ঠিক সন্ধ্যাতে জগদীশবাবুর বাড়িতে থেকো। আমরা বললাম — থাকব; আমাদের স্পোর্টের চাঁদা নেবার জন্য আজ ঠিক সন্ধ্যাতেই জগদীশবাবুর কাছে যাব! ২ বড়ো চমৎকার আজকে এই সন্ধ্যার চেহারা। আমাদের শহরের গায়ে কতদিন তো চাঁদের আলো পড়েছে, কিন্তু কোনোদিন তো আজকের মতো এমন একটা স্নিগ্ধ ও শান্ত উজ্জ্বলতা কখনও চারদিকে এমন সুন্দর হয়ে ফুটে ওঠেনি। ফুরফুর করে বাতাস বইছে। জগদীশবাবুর বাড়ির বাগানের সব গাছের পাতাও ঝিরিঝিরি শব্দ করে কী যেন বলতে চাইছে। জগদীশবাবুর বাড়ির বারান্দাতে মস্ত বড়ো একটা আলো জ্বলছে। সেই আলোর কাছে একটা চেয়ারের উপর বসে আছেন জগদীশবাবু। সাদা মাথা, সাদা দাড়ি, সৌম্য শান্ত ও জ্ঞানী মানুষ জগদীশবাবু। আমরা আমাদের স্পোর্টের চাঁদার খাতাটিকে জগদীশবাবুর হাতে তুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। চমকে উঠলেন জগদীশবাবু। বারান্দার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে জগদীশবাবুর দুই বিস্মিত চোখ অপলক হয়ে গেল। আমরাও চমকে উঠেছি বইকি। আশ্চর্য হয়েছি, একটু ভয়ও পেয়েছি। কারণ, সত্যিই যে বিশ্বাস করতে পারছি না, সিঁড়ির কাছে এসে যে দাঁড়িয়েছে, সে কি সত্যিই হরিদা? ও চেহারা কি সত্যিই কোনো বহুরূপীর হতে পারে? জটাজুটধারী কোনো সন্ন্যাসী নয়। হাতে কমণ্ডলু নেই, চিমটে নেই। মৃগচর্মের আসনও সঙ্গে নেই। গৈরিক সাজও নেই। আদুড় গা, তার উপর একটি ধবধবে সাদা উত্তরীয়। পরনে ছোটো বহরের একটি সাদা থান। মাথায় ফুরফুর করে উড়ছে শুকনো সাদা চুল। ধুলোমাখা পা, হাতে একটা ঝোলা, সে ঝোলার ভিতরে শুধু একটা বই, গীতা। গীতা বের করে কী-যেন দেখলেন এই আগন্তুক। তারপর নিজের মনেই হাসলেন। আগন্তুক এই মানুষটি যেন এই জগতের সীমার ওপার থেকে হেঁটে হেঁটে চলে এসেছেন। শীর্ণ শরীরটাকে প্রায় অশরীরী একটা চেহারা বলে মনে হয়। কী অদ্ভুত উদাত্ত শান্ত ও উজ্জ্বল একটা দৃষ্টি এই আগন্তুকের চোখ থেকে ঝরে পড়ছে! উঠে দাঁড়ালেন জগদীশবাবু — আসুন। আগন্তুক হাসেন — আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়ো? জগদীশবাবু কিছু ভেবে বলেন — কেন? কেন আপনি একথা বলছেন মহারাজ? আমি মহারাজ নই, আমি এই সৃষ্টির মধ্যে এক কণা ধূলি। —কিন্তু আপনি বোধহয় এগারো লক্ষ টাকার সম্পত্তির অহংকারে নিজেকে ভগবানের চেয়েও বড়ো বলে মনে করেন। তাই ওখানেই দাঁড়িয়ে আছেন, নেমে আসতে পারছেন না। সেই মুহূর্তে সিঁড়ি ধরে নেমে যান জগদীশবাবু। — আমার অপরাধ হয়েছে। আপনি রাগ করবেন না।
আগন্তুক আবার হাসেন — আমি বিরাগী, রাগ নামে কোনো রিপু আমার নেই। ছিল একদিন, সেটা পূর্বজন্মের কথা। জগদীশবাবু — বলুন, এখন আপনাকে কীভাবে সেবা করব? বিরাগী বলেন — ঠান্ডা জল চাই, আর কিছু চাই না। ঠান্ডা জল খেয়ে নিয়ে হাঁপ ছাড়েন বিরাগী। এদিকে ভবতোষ আমার কানের কাছে ফিসফিস করে। — না না, হরিদা নয়। হতেই পারে না। অসম্ভব! হরিদার গলার স্বর এরকমেরই নয়। বিরাগী বলেন — পরম সুখ কাকে বলে জানেন? সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া! ভবতোষের কানের কাছে মুখ এগিয়ে দিয়ে অনাদি বলে — শুনছো তো? এসব ভাষা কি হরিদার মুখের ভাষা হতে পারে? জগদীশবাবু ততক্ষণে সিঁড়ির উপরে বসে পড়েছেন। বোধহয় বিরাগীর পা স্পর্শ করবার জন্য তাঁর হাত দুটো ছটফট করতে শুরু করেছে। জগদীশবাবু বলেন — আমার এখানে কয়েকটা দিন থাকুন বিরাগীজি। আপনার কাছে এটা আমার প্রাণের অনুরোধ। দুই হাত জোড় করে বিরাগীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন জগদীশবাবু। বিরাগী হাসেন — বাইরে খোলা আকাশ থাকতে আর ধরিত্রীর মাটিতে স্থান থাকতে, আমি এক বিষয়ীর দালান বাড়ির ঘরে থাকব কেন, বলতে পারেন? — বিরাগীজি! জগদীশবাবুর গলার স্বরের আবেদন করুণ হয়ে ছলছল করে। বিরাগী বলেন — না, আপনার এখানে জল খেয়েছি, এই যথেষ্ট। পরমাত্মা আপনার কল্যাণ করুন। কিন্তু আপনার এখানে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। জগদীশবাবু — তবে অন্তত একটু আজ্ঞা করুন, যদি আপনাকে কোনো… বিরাগী — না না, আমি যার কাছে পড়ে আছি, তিনি আপনার চেয়ে কিছু কম নয়। কাজেই আপনার কাছে আমার তো কিছু চাইবার দরকার হয় না। জগদীশবাবু — তবে কিছু উপদেশ শুনিয়ে যান বিরাগীজি, নইলে আমি শান্তি পাব না। বিরাগী — ধন জন যৌবন কিছুই নয় জগদীশবাবু। ওসব হলো সুন্দর সুন্দর এক-একটি বঞ্চনা। মন-প্রাণের সব আকাঙ্ক্ষা নিয়ে শুধু সেই একজনের আপন হতে চেষ্টা করুন, যাঁকে পেলে এই সৃষ্টির সব ঐশ্বর্য পাওয়া যায়।… আচ্ছা আমি চলি। জগদীশবাবু বলেন — আপনি একটা মিনিট থাকুন বিরাগীজি। সিঁড়ির উপরে অচঞ্চল হয়ে একটা মিনিট দাঁড়িয়ে রইলেন বিরাগী। আজকের চাঁদের আলোর চেয়েও স্নিগ্ধ হয়ে এক জ্যোৎস্না যেন বিরাগীর চোখ থেকে ঝরে পড়ছে। ভবতোষ ফিসফিস করে — না না, ওই চোখ কি হরিদার চোখ হতে পারে? অসম্ভব! জগদীশবাবুর হাতে একটা থলি। থলির ভিতরে নোটের তাড়া। বিরাগীর পায়ের কাছে থলিটাকে রেখে দিয়ে ব্যাকুল স্বরে প্রার্থনা করেন জগদীশবাবু — এই প্রণামী, এই সামান্য একশো এক টাকা গ্রহণ করে আমাকে শান্তি দান করুন বিরাগীজি। আপনার তীর্থ ভ্রমণের জন্য এই টাকা আমি দিলাম। বিরাগী হাসেন — আমার বুকের ভেতরেই যে সব তীর্থ। ভ্রমণ করে দেখবার তো কোনো দরকার হয় না। জগদীশবাবু — আমার অনুরোধ বিরাগীজি… বিরাগী বলেন — আমি যেমন অনায়াসে ধুলো মাড়িয়ে চলে যেতে পারি, তেমনই অনায়াসে সোনাও মাড়িয়ে চলে যেতে পারি। বলতে বলতে সিঁড়ি থেকে নেমে গেলেন বিরাগী। একশো এক টাকার থলিটা সিঁড়ির উপরেই পড়ে রইল। সেদিকে ভুলেও একবার তাকালেন না বিরাগী। ৩ —কী করছেন হরিদা কী হলো? কই? আজ যে বলেছিলেন জবর খেলা দেখাবেন, সে-কথা কি ভুলেই গেলেন। আজকের সন্ধ্যাটা ঘরে বসেই কাটিয়ে দিলেন কেন? বলতে বলতে আমরা সবাই হরিদার ঘরের ভিতরে ঢুকলাম। হরিদার উনানের আগুন তখন বেশ গনগনে হয়ে জ্বলছে। উনানের উপর হাঁড়িতে চাল ফুটছে। আর, একটা বিড়ি ধরিয়ে নিয়ে হরিদা চুপ করে বসে আছেন। আমাদের দেখতে পেয়েই লজ্জিতভাবে হাসলেন। —কী আশ্চর্য! চমকে ওঠে ভবতোষ। —হরিদা, আপনি তাহলে সত্যিই বের হয়েছিলেন! আপনিই বিরাগী? হরিদা হাসেন — হ্যাঁ রে ভাই। ওই তো সেই সাদা উত্তরীয়টা পড়ে রয়েছে মাদুরের উপর, আর সেই ঝোলাটা আর সেই গীতা। অনাদি বলে — এটা কী কাণ্ড করলেন, হরিদা? জগদীশবাবু তো অত টাকা সাধলেন, অথচ আপনি একেবারে খাঁটি সন্ন্যাসীর মতো সব তুচ্ছ করে সরে পড়লেন? হরিদা — কী করব বল? ইচ্ছেই হলো না। না শত হোক… ভবতোষ — কী? হরিদা — শত হোক, একজন বিরাগী সন্ন্যাসী হয়ে টাকা-ফাকা কি করে স্পর্শ করি বল? তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়। কী অদ্ভুত কথা বললেন হরিদা! হরিদার একথার সঙ্গে তর্ক চলে না। আর, বুঝতে অসুবিধে নেই, হরিদার জীবনের ভাতের হাঁড়ি মাঝে মাঝে শুধু জল ফুটিয়েই সারা হবে। অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না। অনাদি বলে — কিন্তু আপনি কি জগদীশবাবুর কাছে গিয়ে আর কখনও… চেঁচিয়ে হেসে ওঠেন হরিদা — যাবই তো। না গিয়ে উপায় কী? গিয়ে অন্তত বকশিশটা তো দাবি করতে হবে? — বকশিশ? চেঁচিয়ে ওঠে ভবতোষ। সেটা তো বড়োজোর আট আনা কিংবা দশ আনা। হরিদা বিড়ি মুখে দিয়ে লজ্জিতভাবে হাসেন — কী আর করা যাবে বল? খাঁটি মানুষ তো নয়, এই বহুরূপীর জীবনে এর বেশি কী আশা করতে পারে? সুবোধ ঘোষ (১৯১০ – ১৯৮০): প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ বিহারের হাজারিবাগে জন্মগ্রহণ করেন। আদি নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুর মহকুমার বহর গ্রামে। বিচিত্র কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ এই লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলো – ‘পরশুরামের কুঠার’, ‘শুক্লভিসার’, ‘ফসিল’, ‘তিলাঞ্জলি’, ‘গঙ্গোত্রী’, ‘একটি নমস্কারে’, ‘ত্রিয়ামা’, ‘ভারত প্রেমকথা’, ‘জতুগৃহ’, ‘কিংবদন্তীর দেশে’, ‘ভারতীয় ফৌজের ইতিহাস’, ‘ক্যাকটাস’ ইত্যাদি। ছোটোগল্প ছাড়াও তিনি বহু উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিণী’
বিষয়সংক্ষেপ
বহুরূপী গল্পটি মূলত এক বহুরূপীর জীবন নিয়ে লেখা। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা শহরের সবচেয়ে ছোটো গলির মধ্যেই বাস করেন। সেখানে আড্ডাও বসে নিয়মিত। রোজকার চাকরি করতে যাওয়া হরিদার কোনোদিনই পোষাত না। তিনি ছিলেন বহুরূপী। তিনি মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন রূপ ধারণ করতেন—কখনও পাগল সাজতেন, কখনও বাউল, কোনোদিন কাপালিক, কখনওও বোঁচকা কাঁধে বুড়ো কাবুলিওয়ালা, কখনও-বা পুলিশ। তাঁর এইসব রূপ দেখে অনেকেই কিছু পয়সা দিত। এটা তাঁর একরকম রোজগার ছিল। পুলিশ সেজে তিনি ঘুষও নিয়েছেন। তাঁর এইসব বহুরূপীর বেশ দেখে লোকজন বিরক্ত হত, আবার কেউ কেউ খুব আনন্দিত হত, কেউ-বা বিস্মিত হত। বহুরূপী সেজে তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেন। জগদীশবাবুর বাড়ীতে হিমালয়ের গুহাবাসী এক সন্ন্যাসীর আগমন এবং অভ্যর্থনার কথা শুনে মোটা রকমের উপার্জনের আশায় তিনি সন্ন্যাসী সেজে জগদীশবাবুর বাড়ীতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সৌম্য, শান্ত, জ্ঞানী মানুষ জগদীশবাবু। সাদা উত্তরীয়, ছোটো বহরের থান পরে এক বিরাগী মানুষের বেশ ধরে বহুরূপী হরিদা হাজির হয়েছিলেন জগদীশবাবুর বাড়িতে। তাঁর সাজপোশাক, উদাত্ত, শান্ত, উজ্জ্বল দৃষ্টি দেখে কেউ বুঝতেও পারেনি তিনি আসলে হরিদা। যখনই যে রূপ হরিদা ধারণ করতেন, তখনই তিনি সেই রূপ বা সেই চরিত্রটির সঙ্গে এতটাই একাত্ম হয়ে যেতেন যে, তাঁকে বহুরূপী বলে কেউ বুঝতেও পারত না। তিনি সত্যিই যেন মূল চরিত্রটিই হয়ে উঠতেন। এক্ষেত্রেও কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। হরিদা সত্যিই যেন বিরাগী হয়ে উঠেছিলেন। তখন তিনি ধন, যৌবন, সংসার-সব কিছু থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। তাই জগদীশবাবু তাঁকে তীর্থভ্রমণের জন্য টাকা দিতে চাইলেও তিনি তা ফিরিয়ে দেন। আসলে এইভাবে বহুরূপী পেশাটাকেই তিনি যোগ্য সম্মান দিয়েছিলেন। কারণ এই পেশা ছিল তাঁর ভালোবাসা।
“বহুরূপী” গল্পের ছোট বড় প্রশ্ন উত্তরঃ—
হরিদার মতে সব তীর্থ—
Ans: মানুষের বুকের ভিতর
ভবতোষ চেঁচিয়ে উঠেছিল—
Ans: বকশিশের কথা শুনে
‘ঘুষ নিয়ে তারপর মাস্টারের অনুরোধে রক্ষা করেছিলেন সেই নকল — পুলিশ হরিদা’ — ঘুষের পরিমাণ কত ?
Ans: আট আনা;
বিরাগীর চোখ থেকে ঝরে পড়েছিল —
Ans: জ্যোৎস্না
বাইজির ছদ্মবেশে হরিদার রোজগার হয়েছিল—
Ans: আট টাকা দশ আনা
দয়ালবাবুর লিচু বাগানের ভিতরে হরিদা দাঁড়িয়েছিল—
Ans: পুলিশ সেজে
হরিদা পুলিশ সেজে দাঁড়িয়েছিলেন—
Ans: লিচু বাগানে
লিচু বাগানে নকল পুলিশ স্কুলের যে ক — টি ছেলেকে ধরেছিলেন, তার সংখ্যা হল —
Ans: চার
নকল পুলিশকে ঘুষ দিয়েছিলেন—
Ans: স্কুলের মাস্টারমশাই
জগদীশবাবু কেমন স্বভাবের মানুষ ছিলেন ?
Ans: কৃপণ
বড়ো চমৎকার ছিল কোন সময়ের চেহারা ?
Ans: সন্ধ্যার
বিরাগীরূপী হরিদার গায়ে ছিল কেবলমাত্র একটি—
Ans: উত্তরীয়
বিরাগীর ঝোলার ভিতর যে — বইটি ছিল, সেটি হল—
Ans: গীতা
জগদীশবাবুর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল—
Ans: এগারো লক্ষ টাকার
রাগ হল এক ধরনের—
Ans: রিপু
লেখকের কানের কাছে ফিসফিস করে যে — বলেছিল — ‘না না, হরিদা নয়। হতেই পারে না।’ তার নাম হল —
Ans: ভবতোষ
জগদীশবাবু বিরাগীজিকে প্রণামী দিয়েছিলেন—
Ans: একশো টাকা
বিরাগী আসলে ছিলেন —
Ans: হরিদা
ভবতোষ ভেবেছিল জগদীশবাবু হরিদাকে বকশিশ হিসেবে দেবেন —
Ans: আট আনা বা দশ আনা
সপ্তাহে হরিদা বহুরূপী সেজে বাইরে যান—
Ans: একদিন
সন্ন্যাসী সারাবছর খেতেন—
Ans: একটি হরিতকী
‘বাসের যাত্রীরা কেউ হাসে, কেউ বা বেশ বিরক্ত হয় কেউ আবার বেশ বিস্মিত।’-বাসযাত্রীদের এমন প্রতিক্রিয়ার কারণ –
Ans- বহুরূপী হরিদার পাগলের সাজটা চমৎকার
‘সে ভয়ানক দুর্লভ জিনিস’ — দুর্লভ জিনিসটি হল—
Ans: সন্ন্যাসীর পদধূলি
হরিদার শীর্ণ শরীরটা দেখে মনে হয়েছিল –
Ans: অশরীরী
সন্ন্যাসী জগদীশবাবুর বাড়িতে ছিলেন –
Ans: সাত দিন
সন্ন্যাসী থাকেন –
Ans: হিমালয়ের গুহাতে
হরিদার ঘরে আড্ডা দিত—
Ans: চার জন
লেখক ও তার বন্ধুরা কোন কোন সময়ে আড্ডা দিতেন ?
Ans: সকালসন্ধ্যে
হরিদার কাছে যা অসম্ভব, তা হল –
Ans: রোজই একটা চাকরির কাজ করে যাওয়া
হরিদার ছোট ঘরটির অবস্থান –
Ans: শহরের সবচেয়ে সরু গলির ভিতরে
হরিদার জীবনজুড়ে ছিল –
Ans: নাটকীয় বৈচিত্র্য
মাঝে মাঝে সত্যিই হরিদা যা করতেন, তা হল
Ans: উপোস
যারা বহুরূপীর সাজে হরিদাকে চিনতে পারে তারা বকশিশ দেয় –
Ans: এক আনা দু – আনা
দুপুরবেলায় আতঙ্কের হল্লা বেজে উঠেছিল-
Ans: চকের বাস স্ট্যান্ডে
চকের বাস স্ট্যান্ডে আতঙ্কের হল্লা বেজে ওঠার কারণ ছিল –
Ans: একটি উন্মাদ পাগল
পাগলটা যা হাতে তুলে নিয়ে বাসের যাত্রীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছিল, তা হল –
Ans: একটা থান ইট
বাসের ড্রাইভারের নাম ছিল –
Ans: কাশীনাথ
‘খুব হয়েছে হরি, এইবার সরে পড়ো। অন্যদিকে যাও।’ কথা বলেছে –
Ans: কাশীনাথ
প্রায় নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছিল—
Ans: একজন বাইজি
শহরে যারা নতুন এসেছে, তারা –
Ans: দু – চোখ বড়ো করে তাকিয়ে থাকে
জগদীশবাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসীর বয়স –
Ans: হাজার বছরের বেশি
জগদীশবাবু একজোড়া কাঠের খড়মে যা লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরলেন, তা হল –
Ans: সোনার বোল
সন্ন্যাসীকে বিদায় দেওয়ার সময় জগদীশবাবু তাকে জোর করে দিয়েছিলেন—
Ans: একটা একশো টাকার নোট
- ‘বহুরূপী’ গল্পটির উৎস লেখ।
=> সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ -এর ‘গল্প সমগ্র’-এর তৃতীয় খণ্ডের অন্তর্গত পাঠ্য গল্পটি। - জগদীশ বাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসীর পরিচয় দাও।
=> তার বাড়িতে 7 দিন ধরে থাকা সন্ন্যাসী খুব উঁচু দরের, হিমালয়ের গুহাতে থাকেন, বছরে 1টি মাত্র হরিতকী খান, বয়স হাজার বছরেরও বেশি। - ‘সে ভয়ানক দুর্লভ জিনিস’ – দুর্লভ জিনিসটি কী ?
=> সন্ন্যাসীর পায়ের ধূলো। - ‘সেই ফাঁকে জগদীশবাবু পায়ের ধূলো নিয়েছিলেন’- কীভাবে ?
=> আগত সন্ন্যাসীকে সোনার বোল লাগানো কাঠের খড়ম এগিয়ে দিলে এবং সেটি পরার সময় জগদীশবাবু তার পায়ের ধূলো নিয়েছিলেন। - ‘আমাদের চারজনের সকাল-সন্ধ্যা আড্ডার ঘর’- 4 জন কে কে ?
=> হরিদা, ভবতোষ, অনাদি এবং কথক। - ‘এক ঘেয়ে কাজ করতে ভয়ানক আপত্তি’ – কেন ?
=> ঘড়ির কাঁটা ধরে নিয়মমতো একই কাজ করায় কোনো বৈচিত্র্য না থাকায় তার আপত্তি রয়েছে। - ‘সেটাই যে হরিদার জীবনের পেশা’ – পেশাটি কী ?
=> বিভিন্ন সময় বহুরূপীর বিভিন্ন বেশ ধারণ করে আনন্দ দান করায় তার জীবনের পেশা। - ‘একটা আতঙ্কের হল্লা বেজে উঠেছিল’ – কোথায়, কেন ?
=> চকের বাসস্ট্যান্ডে পাগলের ছদ্মবেশে থাকা হরিদাকে দেখে আতঙ্কের হল্লা বেজে উঠেছিল। - ‘তারা দুই চোখ বড়ো করে তাকিয়ে থাকে’ – কারা, কেন ?
=> রূপসী বাইজির ছদ্মবেশে হরিদাকে দেখে শহরের নতুন আসা ব্যক্তিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। - বাইজির ছদ্মবেশে হরিদার কত উপার্জন হয়েছে ?
=> আট টাকা দশ আনা। - হরিদার কোন কোন রূপের কথা আলোচিত হয়েছে ?
=> পাগল, রূপসি বাইজি, বাউল, কাপালি, কাবুলিওয়ালা, হ্যাট-কোট পেন্টলুন ফিরিঙ্গি সাহেব, পুলিশ, বিরাগী ছদ্মবেশের কথা আলোচিত হয়েছে। - ‘সে ভয়ানক দুর্লভ জিনিস’- বক্তা কে? কাকে কেন দুর্লভ বলা হয়েছে ?
=> সুবোধ ঘোষের গল্প তৃতীয় খণ্ডের অন্তর্গত বহুরূপী সন্ন্যাসীর প্রসঙ্গে হরিদা একথা বলেছেন।
এখানে দুর্লভ বলতে সন্ন্যাসীর পায়ের ধূলোকে বোঝানো হয়েছে। যে সন্ন্যাসী 7 দিন যাবৎ জগদীশবাবুর বাড়িতে এসেছেন। উঁচু দরের সন্ন্যাসী হওয়ায় তিনি থাকেন হিমালয়ে, খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করেন বছরে মাত্র 1 টি হরিতকী। হাজার বছরেরও বেশি বয়সের অধিকারী এরকম সন্ন্যাসী বিরল, দুর্লভ, সাধারণের সান্নিধ্যে আসে না। গ্রামের অবস্থাপন্ন জমিদার জগদীশবাবুর বাড়িতে এই অসাধারণ মানুষটি পদার্পণ করেছেন। ধনী ব্যক্তি হওয়ায় জগদীশবাবুকে তার পায়ের ধূলো, আশীর্বাদ দিয়েছেন। অন্যদিকে হরিদা সাধারণ এবং দরিদ্র মানুষ হওয়ায় ওই অসাধারণ ব্যক্তি তাকে পায়ের ধূলো, আশীর্বাদ দেবেন না বলে কথকের মনে হয়েছে। - ‘হরিদার জীবনে সত্যিই একটি নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে’-বক্তা কে ? হরিদার পরিচয়সহ নাটকীয় বৈচিত্র্যতা ব্যাখ্যা কর।
=> সুবোধ ঘোষের বহুরূপী গল্পের প্রধান ও কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা। তাকে কেন্দ্র করে বিশেষ এক বক্তব্য গল্পকার আমাদের শুনিয়েছেন।
হরিদা খুব গরীব হলেও ইচ্ছা করলে কোনো অফিসের কাজ কিংবা বিক্রেওয়ালার কাজ সহজেই পেতেন। কিন্তু ঘড়ি ধরে কাজ বা সময় মেপে কাজ করতে তিনি অনিচ্ছুক। এজন্যই বাধা ধরা কাজ ছেড়ে তিনি চা তৈরি করার বা বহুরূপীর মতো ইচ্ছা মাফিক কাজকেই বেছে নিয়েছেন।
ইচ্ছা মাফিক বহুরূপীর এই কাজে তিনি তৃপ্তি বোধ করেন। একদিন চকের বাসস্ট্যান্ডে হরিদার পাগলের রূপ ধারণ করেন। তাতে মুখ থেকে লালা ঝরে, কটকটে লাল চোখ, কোমরে ছেঁড়া কম্বল, গলায় টিনের কৌটোর মালা এবং হাতে ইট তুলে যাত্রীদের দিকে তেড়ে যান। যাত্রীরা কেউ চিনতে না পারলেও ড্রাইভার কাশীনাথ তাকে চিনতে পারে। সেখান থেকে তাকে সরে যেতে বলে। এইরকম একাধিক রূপে তিনি দর্শককে আনন্দ দান করেছেন। তাদের সাধ্য মতো বকশিস গ্রহণ করেছেন। কখনও সেজেছেন বাইজি, কাপালি, বাউল, কাবুলিওয়ালা, পুলিশ বা বিরাগীর নিখুঁত ছদ্মবেশ। তার অভিনয়ে দর্শকচিত্ত আনন্দ লাভ করেছে। এতে তার সংসার, জীবন স্বচ্ছল না হলেও ন্যূনতম উপার্জনেই তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন। কারণ এক ঘেয়েমি কাজে বা চাকরিতে উপার্জন যথাযথ হলেও মানসিক সন্তুষ্টি, স্বাধীনতা সবসময় পাওয়া যায় না। তাই বৈচিত্র্যহীন জীবন -জীবিকা ছেড়ে তিনি এই বৈচিত্র্যপূর্ণ স্বাধীনতার নাটকীয় জীবনকেই বেছে নিয়েছে। - ‘আমাদের সন্দেহ মিথ্যে নয়’ -কাদের, কোন সন্দেহ ?
=> অনাদি, ভবতোষ ও কথকের সন্দেহ। সন্ন্যাসীর গল্পটি শুনে হরিদা গম্ভীর হয়ে গেলে তারা মনে করে হরিদা নিশ্চয় এবার কিছু করবে। সন্ন্যাসীর ঘটনার প্রেক্ষিতে কিছু করাকে সন্দেহ বলা হয়েছে। - ‘মোটা মতো কিছু আদায় করে নেব’ – বক্তা কে ? কী বুঝিয়েছেন ?
=> বক্তা হরিদা। মোটা মতো বলতে বেশি পরিমাণ টাকা আদায় করার কথা বলেছেন। - ‘মারি তো হাতি লুন্ঠিত ভান্ডার’ – ব্যাখ্যা লেখ।
=> হরিদা তার ছদ্মবেশের মাধ্যমে অল্প পরিমাণ টাকার পরিবর্তে এমন কিছু করবেন যাতে অধিক পরিমাণে টাকা আদায় করতে পারে। যাতে তার সারা বছরটা চলে যাবে। - কথকের মতে জগদীশবাবু হরিদাকে কত বকশিস দিতে পারে ?
=> পাঁচ আনার বেশি নয়। - চমৎকার আজকের এই সন্ধ্যার চেহারা – সন্ধ্যার বর্ণনা দাও।
=> জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ ও শান্ত উজ্জ্বলতায় চারিদিক সুন্দর হয়ে উঠেছে, ফুরফুরে বাতাস বইছে, গাছের পাতা ঝিরঝিরি শব্দে কিছু বলতে চাইছে। - জগদীশবাবু কোথায় বসেছিলেন তার বর্ণনা দাও।
=> জগদীশবাবু চেয়ারের উপর বসেছিলেন। তার সাদা মাথা, সাদা দাড়ি, সৌম্য শান্ত, জ্ঞানী মানুষ-এর আচরণ। - ‘চমকে উঠলেন জগদীশবাবু’-কেন ?
=> বিরাগীরূপী হরিদার ছদ্মবেশে চমকে উঠলেন।
তার হাতে কমন্ডুলু, চিমটে নয়, মৃগচর্মের আসনও নেই, গৈরিক সাজও নেই। পরিবর্তে রয়েছে আদুড় গা, ওপরে একটি ধবধবে সাদা উত্তরীয়, পরনে ছোট বহরের সাদা থান। মাথায় ফুরফুরে করছে শুকনো সাদা চুল, ধুলো মাখা পা, হাতে একটা ঝোলা, ঝোলার ভিতরে গীতা। - ‘বহুরূপী’ গল্প অবলম্বনে হরিদার চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা কর। (Only for west bengal board)
=> সুবোধ ঘোষ রচিত বহুরূপী গল্পে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসাবে হরিদার নিম্নলিখিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি আমরা লক্ষ্য করি –
i. সরলতা – হরিদা দরিদ্র হলেও জটিল বা লোভী নয়। তার সাধারণ জীবন -যাপন পদ্ধতি ও ন্যূনতম চাহিদা তার জীবনের সরলতাকে প্রকাশ করে। তার নিখুঁত ছদ্মবেশ ও অভিনয়ে দর্শক মুগ্ধ হলেও কখনও কাউকে প্রতারিত করেননি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থগ্রহণ করেনি।
ii. সততা – হরিদা যোগ্য বহুরূপী হওয়ায় বহুরূপীর সত্ত্বাকে উপলব্ধি করেছে। দারিদ্রে জীবন কাটালেও বহুরূপীর বৃত্তিকে সততার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। জীবনের গভীর দিককে উপলব্ধি করেছেন, একঘেয়েমি বৃত্তি ছেড়ে নাটকীয় বৈচিত্রতাকে গ্রহণ করেছেন।
iii. নিখুঁত অভিনেতা : বৃত্তিকে ভালোবাসায় তিনি অর্থকে, অর্থের লোভকে ত্যাগ করেছেন। এই নির্লোভ মানসিকতা তাকে নিখুঁত অভিনয়ে সাহায্য করেছে। তার অভিনয়ের বিভিন্ন রূপে দর্শকরা মুগ্ধ হয়েছে, প্রশংসা করেছে। তার পরিচিত বন্ধুরাও এই জন্যই বিরাগী-হরিদাকে চিহ্নিত করতে পারেননি।
iv. দারিদ্র্য : হরিদা তার বহুরূপীর সত্ত্বাকে ভালোবাসায় সহজেই দারিদ্রকে ভালোবেসেছেন। মাঝে মধ্যে ভাতের হাঁড়ি চাপালেও কখনও কখনও চাল ছাড়াই শুধুমাত্র জল ফুটেছে। দারিদ্রকে ভালো না বাসলে এই অভাবকে তিনি কখনই মেনে নিতে পারতেন না।
v. শিল্পীসত্ত্বা : হরিদা চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্যটি হল তার শিল্পীসত্ত্বা। অভিনয়ের এই শিল্পকে ভালোবাসেন বলেই নির্দিষ্ট বেশে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট শিল্পী সত্তাই দেখা দিয়েছে। অভাবী হলেও জগদীশবাবুর দেওয়া একশো এক টাকা সহজেই ফিরিয়ে দিয়েছেন, কারণ বিরাগী সত্ত্বা কখনই অর্থকেন্দ্রিক হয় না। আবার বাইজি বা পাগলের ছদ্মবেশে অভিনয় করে প্রাপ্ত অর্থকে সহজেই গ্রহণ করেছেন। এই মৌলিক চিন্তাধারাই তার শৈল্পিক মনকে, চিত্তকে প্রকাশ করে।
এইভাবেই সুবোধ ঘোষের কলমে হরিদা একটি মৌলিক বিচিত্র ও কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসাবে গল্পটিকে সার্থক করে তুলতে সাহায্য করেছে। - ‘কী অদ্ভুত কথা বললেন হরিদা’ – কথাটি কী ?
=> বিরাগীর, সন্ন্যাসীর হয়ে টাকা স্পর্শ করলে তার ঢং বা তার শিল্পীসত্ত্বা নষ্ট হয়ে যাবে। - ‘অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না’-অদৃষ্ট কী ? কোন ভুল ?
=> অদৃষ্ট কথাটির অর্থ ভাগ্য বা ভবিষ্যৎ। দরিদ্র হয়েও বিরাগীরূপী হরিদা জগদীশবাবুর দেওয়া টাকা ফিরিয়ে দিয়েছেন। দরিদ্র হয়েও টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার এই ঘটনাকেই ভুল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। - ‘ওসব হল সুন্দর সুন্দর এক একটি বঞ্চনা’ – ওসব কী ? এগুলিকে বঞ্চনা বলা হয়েছে কেন ?
=> ওসব বলতে ধন, জন ও যৌবনকে বোঝানো হয়েছে। এগুলি মানুষের কাছে কিছু সময়ের জন্য উপস্থিত হলেও চিরকালীন ভাবে থাকে না। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের পর আমাদের সাথে বঞ্চনা করায় সাধারণ দৃষ্টিতে আমাদের প্রিয় এই বিষয়গুলিকে সুন্দর সুন্দর বঞ্চনা বলা হয়েছে। - ‘সেটা পূর্ব জন্মের কথা’ – কথাটি কী ?
=> কথাটি হল হরিদা বিরাগী হওয়ায় বর্তমানে তার রাগ নামক কোনো রিপু নেই। যা পূর্ব জন্মে ছিল। - ‘কিছু উপদেশ শুনিয়ে যান বিরাগীজি’ – বিরাগী কী শুনিয়েছিলেন ?
=> উপদেশটি হল – ধন, জন, যৌবন এগুলি এক একটি সুন্দর সুন্দর প্রবঞ্চনা।
৩ ও ৫ নাম্বার প্রশ্ন ও উত্তর
১. ‘বহুরূপী’ গল্প অনুসারে হরিদার চরিত্র আলোচনা করো।
অথবা
“খাঁটি মানুষ তো নয়, এই বহুরূপীর জীবন এর বেশি কি আশা করতে পারে?” – উক্তির আলোকে বক্তার চরিত্র বিশ্লেষণ করো।
২. ‘হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে’
– হরিদার জীবনে নাটকীয় বৈচিত্র্যের বর্ণনা দাও।
অথবা
“এই শহরের জীবনে মাঝে মাঝে বেশ চমৎকার ঘটনা সৃষ্টি করেন বহুরূপী হরিদা।” – ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদার সৃষ্ট চমৎকার ঘটনাগুলির পরিচয় দাও।
৩. জগদীশবাবুর বাড়িতে হরিদা বিরাগী সেজে যাওয়ার পর কী ঘটনা ঘটেছিল তা লেখো। / “আজ তোমাদের একটা জবর খেলা দেখাবো”।
৪. ‘গল্প শুনে খুব গম্ভীর হয়েগেলেন হরিদা’ – হরিদা কে? কোন গল্প শুনে কেন হরিদা গম্ভীর হয়ে গেলেন?
প্রশ্নমান – ৩
১. হরিদার বহুরূপী সাজ (পাগল, পুলিশ, বাইজি, বিরাগী)
২. ‘বড়ো চমৎকার আজকের এই সন্ধ্যার চেহারা’ – আজকে বলতে কোন দিনের কথা বলা হয়েছে? সেই দিন সন্ধ্যার চেহারার বর্ণনা দাও।
৩. ‘সে ভয়ানক দুর্লভ জিনিস’ – কোন জিনিসের কথা বলা হয়েছে? তা দুর্লভ কেন? / ‘তা পেতেন না হরিদা’
৪. জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা সন্ন্যাসীর পরিচয় দাও।
৫. ‘আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়ো?’ – বক্তা কে? বক্তা কাকে কেন এ কথা বলেছেন? উদ্দিষ্ট ব্যক্তি এ প্রশ্নের কী জবাব দিয়েছিলেন? / ‘আমার অনুরোধ রাখতেই হবে। আপনি রাগ করবেন না।’
৬. ‘এবার মারি তো হাতি, লুঠিতো ভান্ডার’ – কথাটি কে বলেছে? বক্তার প্রশ্ন কথাটি বলার উদ্দেশ্য কী ছিল?
আপনার প্রশ্নের উত্তরগুলি নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হল।
প্রশ্নমান – ৫
১. ‘বহুরূপী’ গল্প অনুসারে হরিদার চরিত্র আলোচনা করো।
অথবা
“খাঁটি মানুষ তো নয়, এই বহুরূপীর জীবন এর বেশি কি আশা করতে পারে?” – উক্তির আলোকে বক্তার চরিত্র বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের লেখা ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন হরিদা। তিনি একাধারে দরিদ্র, শিল্পী এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এক অদ্ভুত মানুষ। তাঁর চরিত্রটি কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের আলোকে আলোচনা করা হলো:
- শিল্পীসত্তা ও পেশার প্রতি ভালোবাসা: হরিদা বহুরূপীর পেশাটিকে কেবল অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে একটি শিল্প হিসেবে ভালোবাসতেন। ঘড়ি ধরে একঘেয়ে কাজ করা তাঁর অপছন্দ ছিল। বিভিন্ন চরিত্রে নিজেকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলে তিনি একধরনের আত্মতৃপ্তি লাভ করতেন।
- নির্লোভ ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন: হরিদার চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর নির্লোভী মনোভাব। জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সেজে গিয়ে তিনি একশো এক টাকা প্রণামী পাওয়ার সুযোগ পেয়েও তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তাঁর মতে, বিরাগী সেজে টাকা স্পর্শ করলে তাঁর শিল্পীসত্তার অপমান হবে। এই ঘটনা তাঁর প্রবল আত্মমর্যাদাবোধের পরিচয় দেয়।
- দারিদ্র্য কিন্তু গ্লানিহীনতা: হরিদা अत्यंत দরিদ্র ছিলেন। তাঁর ছোট্ট ঘরে দিনের পর দিন ভাতের হাঁড়িতে শুধু জল ফোটে, কিন্তু এই দারিদ্র্য নিয়ে তাঁর কোনো গ্লানি বা আক্ষেপ ছিল না। তিনি নিজের পছন্দের জীবনযাপনে সন্তুষ্ট ছিলেন।
- নিখুঁত অভিনেতা: হরিদা ছিলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ অভিনেতা। তিনি যখন যে সাজে সজ্জিত হতেন, সেই চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম হয়ে যেতেন। তাঁর পাগলের সাজ দেখে বাসযাত্রীরা আতঙ্কিত হয়েছিল, আবার বিরাগীর রূপে তাঁকে দেখে জগদীশবাবুর মতো জ্ঞানী ব্যক্তিও চিনতে পারেননি।
- রসবোধ ও নাটকীয়তা: হরিদার জীবনে নাটকীয়তা ও রসবোধের মিশ্রণ ছিল। তিনি তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন এবং মাঝে মাঝে তাদের চমকে দিয়ে আনন্দ পেতেন। জগদীশবাবুকে ঠকানোর পরিকল্পনা করার সময় তাঁর “মারি তো হাতি, লুঠিতো ভান্ডার” উক্তিটি তাঁর রসবোধের পরিচয় দেয়।
মূল্যায়ন: পরিশেষে বলা যায়, হরিদা শুধুমাত্র একজন বহুরূপী নন, তিনি একজন প্রকৃত শিল্পী। জাগতিক লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি নিজের শিল্প ও আত্মসম্মানকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিয়েছেন। তাই সাধারণ মানুষের মাপকাঠিতে তিনি ‘খাঁটি মানুষ’ নন, কারণ তাঁর জীবনদর্শন আর পাঁচজনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
“খাঁটি মানুষ তো নয়, এই বহুরূপীর জীবন এর বেশি কি আশা করতে পারে?” – উক্তির আলোকে বক্তার চরিত্র বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
উক্তিটি এসেছে ‘বহুরূপী’ গল্প থেকে এবং বক্তা হলেন স্বয়ং হরিদা। এটি একটি আত্মজিজ্ঞাসামূলক মন্তব্য, যা হরিদার অন্তর্দ্বন্দ্ব ও আত্মবোধের প্রকাশ।
এই উক্তি থেকে বোঝা যায়, হরিদা নিজের জীবন ও সমাজের চোখে নিজের অবস্থান নিয়ে সচেতন ছিলেন। বহুরূপী সেজে মানুষকে বিভ্রান্ত করলেও, তিনি জানতেন সমাজ তাঁকে কখনও ‘খাঁটি মানুষ’ হিসেবে গ্রহণ করেনি। এতে তাঁর হতাশা এবং বঞ্চনার অনুভূতি প্রতিফলিত হয়।
তবে, এই উক্তিতে তাঁর চরিত্রের এক দার্শনিক, আত্মবিশ্লেষণী ও বাস্তববাদী দিক প্রকাশ পায়। তিনি জীবনের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে নিরবে সহ্য করেন এবং সমাজের মুখোশ উন্মোচন করতে চান।
২. ‘হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে’ – হরিদার জীবনে নাটকীয় বৈচিত্র্যের বর্ণনা দাও।
অথবা
“এই শহরের জীবনে মাঝে মাঝে বেশ চমৎকার ঘটনা সৃষ্টি করেন বহুরূপী হরিদা।” – ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদার সৃষ্ট চমৎকার ঘটনাগুলির পরিচয় দাও।
উত্তর:
সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা তাঁর পেশার মাধ্যমে শহরের একঘেয়ে জীবনে নাটকীয় বৈচিত্র্য ও চমৎকার ঘটনার সৃষ্টি করতেন। গল্পে উল্লিখিত কয়েকটি ঘটনা নিচে আলোচনা করা হলো:
- পাগলের সাজ: একদিন চকের বাসস্ট্যান্ডে হরিদা উন্মাদ পাগলের সাজে আবির্ভূত হন। তাঁর মুখ থেকে লালা ঝরছিল, চোখ ছিল কটকটে লাল, হাতে একটি থান ইট নিয়ে তিনি যাত্রীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর এই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ড্রাইভার কাশীনাথের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এই ঘটনাটি শহরের বুকে এক আকস্মিক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
- পুলিশের সাজ: হরিদা একবার দয়ালবাবুর লিচু বাগানে নকল পুলিশ সেজে স্কুলের চারটি ছেলেকে ধরেছিলেন। তাঁর নিখুঁত অভিনয়ে ছেলেরা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। পরে স্কুলের মাস্টারমশাই এসে আট আনা ঘুষ দিয়ে ছেলেগুলোকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। এই ঘটনাটি হরিদার অভিনয় দক্ষতার এক চমৎকার নিদর্শন।
- বাইজির সাজ: হরিদা একবার সুন্দরী বাইজির সাজে ঘুঙুর পায়ে দিয়ে শহরের রাস্তায় প্রায় নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছিলেন। তাঁর এই রূপ দেখে শহরের লোক মুগ্ধ হয়েছিল এবং তিনি আট টাকা দশ আনা রোজগারও করেছিলেন।
- বিরাগীর সাজ: হরিদার জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা ছিল বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়িতে যাওয়া। ধবধবে সাদা উত্তরীয়, ছোট বহরের থান, মাথায় শুকনো সাদা চুল এবং পায়ে কাঠের খড়ম পরে তিনি যখন আবির্ভূত হন, তখন তাঁকে দেখে স্বয়ং জগদীশবাবুও চিনতে পারেননি। তাঁর শান্ত, সৌম্য রূপ এবং উদাত্ত কণ্ঠস্বরে তিনি সকলকে মুগ্ধ করেন এবং একশো এক টাকার প্রণামী ফিরিয়ে দিয়ে নিজের শিল্পীসত্তার চূড়ান্ত পরিচয় দেন।
এই ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে হরিদার জীবন সত্যিই নাটকীয় বৈচিত্র্যে ভরপুর ছিল এবং তিনি তাঁর শিল্পের মাধ্যমে শহরের জীবনে চমৎকার সব মুহূর্ত তৈরি করতেন।
“এই শহরের জীবনে মাঝে মাঝে বেশ চমৎকার ঘটনা সৃষ্টি করেন বহুরূপী হরিদা।” – ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদার সৃষ্ট চমৎকার ঘটনাগুলির পরিচয় দাও।
উত্তর:
হরিদা তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে শহরের জীবনে চমক সৃষ্টি করতেন। একদিন তিনি পাগলের বেশে এসে বাচ্চাদের ভয় পাইয়ে দেন, আবার বাইজির সাজে উর্দি পরিহিত পুলিশের সামনে নাচ করেন। এমনকি একবার পুলিশের ছদ্মবেশে একজন অপরাধীকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেন।
সবচেয়ে চমৎকার ঘটনা ঘটে যখন তিনি বিরাগীর বেশে জগদীশবাবুর বাড়িতে যান। সেখানে তিনি এমন অভিনয় করেন যে সবাই তাঁকে সত্যিকারের সন্ন্যাসী মনে করে। এই সমস্ত ঘটনাগুলোতে তাঁর অভিনয়ের নিপুণতা এবং নাটকীয় বুদ্ধি প্রকাশ পায়।
৩. জগদীশবাবুর বাড়িতে হরিদা বিরাগী সেজে যাওয়ার পর কী ঘটনা ঘটেছিল তা লেখো। / “আজ তোমাদের একটা জবর খেলা দেখাবো”।
উত্তর:
‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদা তাঁর বন্ধুদের কাছে “একটা জবর খেলা” দেখানোর কথা বলে বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়িতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বড় রকমের কিছু বকশিশ আদায় করা।
জগদীশবাবুর বাড়িতে হরিদা যখন বিরাগী রূপে পৌঁছান, তখন তাঁর চেহারা ছিল একেবারে অচেনা। তাঁর গায়ে ছিল একটি ধবধবে সাদা উত্তরীয়, পরনে ছোট বহরের সাদা থান, মাথায় শুকনো সাদা চুল এবং পায়ে কাঠের খড়ম। তাঁর শান্ত ও সৌম্য চেহারা এবং উদাত্ত কণ্ঠস্বর জগদীশবাবুকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। জগদীশবাবু তাঁকে একজন উঁচু দরের সন্ন্যাসী ভেবে ভুল করেন।
তিনি বিরাগীর পায়ের কাছে একটি টাকার থলি রেখে একশো এক টাকা প্রণামী হিসেবে গ্রহণ করার অনুরোধ করেন। কিন্তু হরিদা টাকা স্পর্শ না করে বলেন যে, তিনি টাকা স্পর্শ করেন না, কারণ তাতে তাঁর ‘ঢং’ নষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন, “আমার বুকের ভেতরেই সব তীর্থ”। এরপর তিনি জগদীশবাবুর কাছ থেকে কেবল একটু ঠান্ডা জল চেয়ে পান করেন এবং সেখান থেকে চলে যান। যাওয়ার আগে তিনি জগদীশবাবুকে আশীর্বাদ করে বলেন যে, পরমাত্মা তাঁর কল্যাণ করুন।
এই ঘটনায় জগদীশবাবু এবং হরিদার বন্ধুরা সকলেই অবাক হয়ে যান। কারণ তারা ভেবেছিল হরিদা মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করবেন, কিন্তু তিনি তা না করে নিজের শিল্পীসত্তার প্রতি মর্যাদা দেখিয়েছিলেন।
৪. ‘গল্প শুনে খুব গম্ভীর হয়েগেলেন হরিদা’ – হরিদা কে? কোন গল্প শুনে কেন হরিদা গম্ভীর হয়ে গেলেন?
উত্তর:
হরিদা: উদ্ধৃত অংশে উল্লিখিত হরিদা হলেন সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি একজন পেশাদার বহুরূপী, যিনি বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হয়ে মানুষের মনোরঞ্জন করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
কোন গল্প শুনেছিলেন: হরিদা তাঁর বন্ধুদের কাছে জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা এক উঁচু দরের সন্ন্যাসীর গল্প শুনেছিলেন। সেই সন্ন্যাসী নাকি হাজার বছরেরও বেশি বয়সী, তিনি হিমালয়ের গুহাতে থাকেন এবং বছরে মাত্র একটি হরিতকী খান। তিনি জগদীশবাবুর বাড়িতে সাতদিন থেকেও কোনো প্রণামী গ্রহণ করেননি। এই গল্পটিই হরিদা শুনেছিলেন।
গম্ভীর হওয়ার কারণ: এই গল্পটি শোনার পর হরিদা দুটি কারণে গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন:
- প্রথমত, তিনি জগদীশবাবুর মতো একজন ধনী ও ভক্ত মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা রোজগারের একটি বড় সুযোগ দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি মনে মনে পরিকল্পনা করছিলেন যে, তিনিও বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর কাছে যাবেন এবং তাঁর এই অভিনয় হবে একটি “জবর খেলা”।
- দ্বিতীয়ত, একজন প্রকৃত শিল্পী হিসেবে তিনি তাঁর পরবর্তী অভিনয়ের চরিত্রটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন। কীভাবে একজন সত্যিকারের বিরাগীর রূপ ধারণ করে জগদীশবাবুকে পুরোপুরি বিশ্বাস করানো যায়, সেই পরিকল্পনাতেই তিনি মগ্ন হয়েছিলেন। তাই একজন শিল্পী হিসেবে চরিত্রের গভীরে প্রবেশের জন্যই তিনি গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন।
প্রশ্নমান – ৩
১. হরিদার বহুরূপী সাজ (পাগল, পুলিশ, বাইজি, বিরাগী):
‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাজ ধারণ করেছেন। যেমন:
- পাগলের সাজ: চকের বাসস্ট্যান্ডে উন্মাদ পাগলের বেশে 나타 হয়ে তিনি যাত্রীদের আতঙ্কিত করেছিলেন।
- পুলিশের সাজ: দয়ালবাবুর লিচু বাগানে নকল পুলিশ সেজে স্কুলের ছেলেদের ধরেছিলেন এবং তাদের মাস্টারের কাছ থেকে আট আনা ঘুষ নিয়েছিলেন।
- বাইজির সাজ: সুন্দরী বাইজির ছদ্মবেশে শহরের রাস্তায় নেচে তিনি আট টাকা দশ আনা উপার্জন করেছিলেন।
- বিরাগীর সাজ: জগদীশবাবুর বাড়িতে তিনি সৌম্য, শান্ত বিরাগীর রূপ ধারণ করে তাঁর শিল্পীসত্তার সর্বোচ্চ পরিচয় দেন এবং মোটা অঙ্কের প্রণামী ফিরিয়ে দেন।
২. ‘বড়ো চমৎকার আজকের এই সন্ধ্যার চেহারা’ – আজকে বলতে কোন দিনের কথা বলা হয়েছে? সেই দিন সন্ধ্যার চেহারার বর্ণনা দাও।
এখানে ‘আজকে’ বলতে সেই দিনটিকে বোঝানো হয়েছে যেদিন হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলেন।
সন্ধ্যার বর্ণনা: সেই দিন সন্ধ্যাবেলা জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ ও শান্ত আলোয় চারিদিক সুন্দর হয়ে উঠেছিল। ফুরফুরে বাতাস বইছিল এবং গাছের পাতার ঝিরঝির শব্দে মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতি কিছু বলতে চাইছে। এই মনোরম পরিবেশই সন্ধ্যার চেহারাটিকে চমৎকার করে তুলেছিল।
৩. ‘সে ভয়ানক দুর্লভ জিনিস’ – কোন জিনিসের কথা বলা হয়েছে? তা দুর্লভ কেন? / ‘তা পেতেন না হরিদা’
এখানে সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলোকে (পদধূলি) ‘ভয়ানক দুর্লভ জিনিস’ বলা হয়েছে।
দুর্লভ হওয়ার কারণ: জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা সন্ন্যাসী ছিলেন একজন উঁচু দরের মহাপুরুষ। তিনি জাগতিক লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে ছিলেন। এমন মানুষের সান্নিধ্য বা তাঁর পায়ের ধুলো পাওয়া অত্যন্ত ভাগ্যের ব্যাপার। তাই তাঁর পায়ের ধুলোকে দুর্লভ বলা হয়েছে।
৪. জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা সন্ন্যাসীর পরিচয় দাও।
জগদীশবাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসী ছিলেন একজন অত্যন্ত উঁচু দরের মহাত্মা। তাঁর বয়স ছিল হাজার বছরেরও বেশি। তিনি হিমালয়ের গুহায় থাকতেন এবং বছরে মাত্র একটি হরিতকী খেয়ে জীবনধারণ করতেন। তিনি জগদীশবাবুর বাড়িতে সাতদিন থেকেও কোনো অর্থ বা দান গ্রহণ করেননি, যা তাঁর নির্লোভী চরিত্রের পরিচয় দেয়।
৫. ‘আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়ো?’ – বক্তা কে? বক্তা কাকে কেন এ কথা বলেছেন? উদ্দিষ্ট ব্যক্তি এ প্রশ্নের কী জবাব দিয়েছিলেন?
বক্তা: এই উক্তির বক্তা হলেন জগদীশবাবু।
কাকে ও কেন বলেছেন: তিনি বিরাগীবেশী হরিদাকে এই কথাটি বলেছিলেন। হরিদা যখন একশো এক টাকার প্রণামী প্রত্যাখ্যান করেন, তখন জগদীশবাবু অবাক হয়ে এবং কিছুটা হতাশ হয়ে এই প্রশ্নটি করেন।
উত্তর: উত্তরে বিরাগীবেশী হরিদা বলেন যে, তাঁর নিজের আশ্রমে তিনি কোনো লোভের স্থান দেন না, তাই টাকা স্পর্শ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
৬. ‘এবার মারি তো হাতি, লুন্ঠিত ভান্ডার’ – কথাটি কে বলেছে? বক্তার প্রশ্ন কথাটি বলার উদ্দেশ্য কী ছিল?
এই কথাটি বলেছে ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা।
উদ্দেশ্য: জগদীশবাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসীর গল্প শোনার পর হরিদা বুঝতে পারেন যে, জগদীশবাবু খুব সহজেই ভক্তি দ্বারা প্রভাবিত হন। তাই তিনি বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর কাছ থেকে একবারে অনেক টাকা আদায় করার পরিকল্পনা করেন, যা দিয়ে তাঁর সারা বছর চলে যাবে। এই বড় রকমের উপার্জনের পরিকল্পনা বোঝাতেই তিনি এই প্রবাদটি ব্যবহার করেছেন।